ফনেটিক ইউনিজয়
সম্ভাবনাময় টার্কি শিল্প: প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ
মো. শাহীন সরদার

পোল্ট্রির ১১টি প্রজাতির মধ্যে টার্কি একটি। টার্কি মেলিয়াগ্রিডিডি পরিবারের এক ধরনের বড় আকৃতির পাখি বিশেষ। দেখতে মুরগির মতো হলেও আকারে অনেক বড়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টার্কি গৃহপালিত পাখি হিসেবে লালন-পালন করা হয়। এরা পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। গরু, খাসি, পোল্ট্রি ও দেশীয় হাঁস-মুরগির মাংসের পরিপূরক হতে পারে। বাংলাদেশে টার্কি পালনের জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত গবেষণা এবং সরকারি ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্বাবিদ্যালয়ে পশুপালন অনুষদের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস নিজ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গী করে গবেষণা করে চলেছেন টার্কি নিয়ে। তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে দেশে টার্কি শিল্পের সম্প্রসারণ, সম্ভাবনা ও অন্তরায় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।

 
সাম্প্রতিক দেশকাল: টার্কি পাখি সম্পর্কে যদি একটু বিস্তারিত জানাতেন।
অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস: আমাদের দেশের অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশে পশুপাখি পালন অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজ। টার্কি পাখি একটি সহনশীল জাত, যে কোনো পরিবেশ দ্রুত এরা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। এরা বেশ নিরীহ ধরনের পাখি। মুক্ত অথবা খাঁচা উভয় পদ্বতিতে পালন করা যায়। ছয় থেকে সাত মাস বয়স থেকে ডিম দেওয়া শুরু করে এবং বছরে দুই থেকে তিনবার ১০ থেকে ১২টি করে ডিম দেয়। একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী টার্কি তিন থেকে চার কেজি এবং পুরুষ টার্কি আট থেকে দশ কেজি ওজন হয়। এদের মাংসের স্বাদ উৎকৃষ্ট। টার্কি লাল শাক, কলমি শাক, বাঁধাকপি ইত্যাদি মৌসুমি শাকসবজি, কচুরিপানা, পোকামাকড় এবং সাধারণ খাবার খেতে অভ্যস্ত।

সা.দে: টার্কি পাখির রোগ-বালাইয়ের ঝুঁকি কেমন?
ড. সুবাস চন্দ্র দাস: টার্কি পাখির তেমন বড় কোনো রোগ-বালাই নেই। তবে রানীক্ষেত, ফাইল পক্স, ফাউল কলেরা, এন্টারাইটিস ইত্যাদি রোগ দেখা দিতে পারে। সময় মতো ভ্যাকসিন প্রদান করলে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। অতিবৃষ্টি বা অতিরিক্ত শীতের সময় মাঝে মাঝে ঠাণ্ডাজনিত রোগ দেখা যায়, ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

সা.দে: টার্কি পালনের কি কি সুবিধা রয়েছে?
ড. সুবাস চন্দ্র দাস: এদের মাংস উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি। টার্কি ব্রয়লার মুরগির থেকেও দ্রুত বাড়ে। ঝামেলাহীনভাবে দেশি মুরগির মতোই পালন করা যায়। টার্কি পালনে তুলনামূলক খরচ কম। তাই অল্প পুঁজিতে একটি আদর্শ টার্কির খামার করা যায়। টার্কির মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি, চর্বি কম। টার্কির মাংসে অধিক পরিমাণ জিংক, লৌহ, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন ই ও ফসফরাস থাকে। এ উপাদানগুলো মানব শরীরের জন্য উপকারি এবং নিয়মিত এ মাংস খেলে কোলেস্টেরল কমে যায়। টার্কির মাংসে এমাইনো এসিড ও ট্রিপটোফেন অধিক পরিমাণে থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

সা.দে: টার্কি পালন পদ্ধতি  সম্পর্কে কিছু বলুন।
ড. সুবাস চন্দ্র দাস: দুইভাবে টার্কি পালন করা যায় ১ মুক্তচারণ পালন পদ্ধতি ও ২ নিবিড় পালন পদ্ধতি।
মুক্তচারণ পালন পদ্ধতিতে এক একর জমিতে ২০০-২৫০টি পূর্ণ বয়স্ক টার্কি পালন করা যায়। রাতে পাখিপ্রতি ৩-৪ বর্গফুট হারে জায়গা লাগে। চরে খাওয়ার সময় তাদের শিকারি জীবজন্তুর হাত থেকে বাঁচাতে হবে। ছায়া ও শীতল পরিবেশের জন্য খামারে গাছ রোপন করতে হবে।
টার্কি খুব ভালোভাবে আবর্জনা খুঁটে খায় বলে এরা কেঁচো, ছোট পোকামাকড়, শামুক, রান্নাঘরের বর্জ্য ও উঁইপোকা খেতে পারে, যাতে প্রচুর প্রোটিন আছে এবং তা খাবারের খরচকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। এছাড়া শিম জাতীয় পশুখাদ্য যেমন লুসার্ন, ডেসম্যান্থাস, স্টাইলো এসব খাওয়ানো যায়। পাখিদের পায়ের দুর্বলতা রোধে খাবারে ঝিনুকের খোল মিশিয়ে সপ্তাহে ২৫০ গ্রাম ক্যালসিয়াম দিতে হবে। মুক্তচারণ ব্যবস্থায় টার্কির গোল কৃমি ও ফাউল মাইট পরজীবী সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই পাখিদের ভালো বিকাশের জন্য মাসে একবার ডিওয়ার্মিং ও ডিপিং করা আবশ্যক।
অপরদিকে নিবিড় পালন পদ্ধতিতে টার্কিদের বাসস্থান রোদ, বৃষ্টি, হাওয়া, শিকারি জীবজন্তু থেকে নিরাপদ ও আরামদায়ক হতে হবে। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ঘরের উচ্চতা ২ দশমিক ৬ থেকে ৩ দশমিক ৩ মিটারের মধ্যে থাকতে হবে। ঘরের মেঝে টেকসই, নিরাপদ ও আর্দ্রতারোধক বস্তু, যেমন কংক্রিটের হওয়া বাঞ্ছনীয়। কম বয়সি এবং প্রাপ্ত বয়স্ক পাখির ঘরের মধ্যে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং পাশাপাশি দুটি ঘরের মধ্যে অন্তত ২০ মিটার দূরত্ব থাকতে হবে। এ পদ্ধতিতে টার্কি পালনের সাধারণ পরিচালনা ব্যবস্থা মুরগি পালনের মতোই, তবে বড় আকারের পাখিটির জন্য যথাযথ বসবাস, ওয়াটারার ও ফিডারের জায়গার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সা.দে: আমাদের দেশে টার্কি পালনের সম্ভাবনা কেমন?
ড. সুবাস চন্দ্র দাস: টার্কি মূলত মাংসের জন্য পালন করা হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে টার্কি পালন দিনে দিনে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। তারা দেখতেও খুব সুন্দর হয়। টার্কি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অন্যান্য পাখির তুলনায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক বেশি হওয়ায় ওষুধের খরচ অতি নগণ্য। বাংলাদেশের আবহাওয়া টার্কি পালনের জন্য খুবই উপযুক্ত। এদের পালন পদ্ধতিও মুরগির মতোই। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে টার্কি পালন করে ভালো মুনাফা অর্জনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। একটুখানি সচেতনতা, সরকারি গবেষণা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে টার্কি হয়ে উঠতে পারে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম। এমনকি ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও উৎস।

Disconnect