ফনেটিক ইউনিজয়
আরও বাড়তে পারে চালের দাম
এম ডি হোসাইন

চাল নিয়ে সংকটে রয়েছে সরকার। এই সংকট সমাধানে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২ শতাংশে আনা হয়েছে। এরপরও কমেনি বাজারে চালের দাম। বরং চালের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমদানি শুল্ক কমানোর পর সরকারিভাবে চালের দাম কমেছে দাবি করা হলেও মোটা চাল এখনো বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৪৬ টাকায়। তবে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৪২ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন ফসল আমন ওঠার আগে আর চালের দাম কমবে না। কারণ বোরো ফসল কাটার পর যত দিন যায় চালের দাম ততই বাড়ে। একটা সাধারণ প্রবণতা হলো, ফসল কাটার পর প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই টাকা হারে চালের দাম বাড়ে। জ্যৈষ্ঠ মাসে ফসল কাটার পর পরবর্তী আমন ফসল উঠবে অগ্রহায়ণ মাসে। অগ্রহায়ণ আসতে এখনো তিন মাস বাকি। এই তিন মাসে প্রতি মাসেই কেজিতে দেড় থেকে দুই টাকা হারে দাম বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা যায়, চালের বাজারে সংকটের কারণে সরকারের ভেতরেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে চাল সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার। তবে চাল আমদানি নিয়ে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সুযোগ বুঝে ভারত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়াসহ রপ্তানিকারক দেশগুলো পাল্লা দিয়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, বাংলাদেশে চালের মজুত তলানিতে নেমে গেছে এবং তারা দ্রুত চাল আমদানি করতে চাইছে এ খবরে ভারত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়াসহ রপ্তানিকারক বিভিন্ন দেশ চালের দাম টনপ্রতি প্রায় ৯০ থেকে ১০০ ডলার বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণে চাল আমদানির জন্য একাধিক দেশের সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের (জি টু জি) চুক্তি ও পত্রালাপ চললেও ভিয়েতনাম ছাড়া অন্য কোনো দেশ থেকে এখনো চাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান বলেন, সিলেটের হাওর অঞ্চলে বন্যায় বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হওয়ায় দেশে এবার অসময়ে চালের দাম বেড়ে গেছে। চালের দাম মূলত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বাড়ার কথা। কারণ, কৃষকের ঘরে যখন নতুন ধান আসে, তখন চালের দাম কম থাকে। আমাদের দেশে বোরো ধান উৎপাদন হয় জুন-জুলাই মাসে। ফলে এ সময়ে চালের দাম কম থাকে। এরপর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আমন ধান আসার আগে দাম বাড়ে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে এবার আগেই চালের দাম বাড়িয়েছেন। ফলে নতুন ধান না আসা পর্যন্ত চালের দাম বাড়তেই থাকবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, যেন আমদানির মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা যায়।’
বদরুল হাসান জানান, সমস্যা হলো, বিশ্বে চালের বাজারটা খুবই ছোট। শুধু দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে চাল উৎপাদন হয়। তাই কোনো দেশে সমস্যা দেখা দিলে অন্য দেশগুলো দাম বাড়িয়ে দেয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ পর্যালোচনা করে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রতি টন চাল ৩৮০ থেকে ৪০০ ডলারে বিক্রি করলেও বাংলাদেশের কাছে দাবি করছে ৪৯০ থেকে ৫৩০ ডলার পর্যন্ত। ফলে দেশে আনা পর্যন্ত ভারতের প্রতি টন সেদ্ধ চালের দাম পড়ছে ৫০৩ দশমিক ৭০ ডলার, থাইল্যান্ডের ৪৯৪ দশমিক ৭ ডলার। এ ছাড়া ভারত থেকে প্রতি টন আতপ চাল আনতে খরচ পড়ছে ৫১৮ দশমিক ৭০ ডলার, থাইল্যান্ড থেকে ৫০৫ দশমিক ৭০ ডলার, ভিয়েতনাম থেকে ৫২৬ দশমিক ৭০ ডলার, পাকিস্তান থেকে ৪৯১ দশমিক ৭০ ডলার এবং কম্বোডিয়া থেকে ৫৩০ দশমিক ৭০ ডলার।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের চাল-সংকট আমদানির মাধ্যমে পূরণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এ জন্য দুই দফায় আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২ শতাংশে আনা হয়েছে। কিন্তু চাল উৎপাদনকারী দেশগুলো এ খবর জানতে পেরে চালের দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন ধান না আসা পর্যন্ত চালের দাম আরও বাড়তে পারে। এদিকে সারা দেশে এবার বন্যা হয়েছে। এতে আমন ধানেরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাই এ সংকট সমাধানের জন্য আমদানি ছাড়া কোনো পথ নেই।
তবে এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দাবি করেন, দেশে চালের কোনো সংকট নেই। খাদ্যের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া থেকে চাল এলে মজুত আরও বেড়ে যাবে। মজুতে ঘাটতি না থাকলে কেন সরকারিভাবে এত দেশ থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে, জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, সরকারি খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমদানির জন্য অনেক উৎস খোলা থাকলে সুবিধা হয়।
চলতি অর্থবছরে সাড়ে ১২ লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রথমেই বেছে নেওয়া হয় ভিয়েতনামকে। জি টু জি পদ্ধতিতে ইতিমধ্যে সেখান থেকে আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২ লাখ টন আতপ চাল টনপ্রতি ৪৩০ এবং ৫০ হাজার টন সেদ্ধ চাল প্রতি টন ৪৭০ ডলারে আনা হচ্ছে। এ চাল আনতে দেশীয় বাজারের চেয়ে বেশি দাম পড়ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরকার প্রতি কেজি চাল কেনে সর্বোচ্চ ৩৪ টাকা দরে। আর ভিয়েতনাম থেকে আনা প্রতি কেজি আতপ চালের দাম পড়ছে প্রায় ৩৬ টাকা এবং সেদ্ধ চালের দাম ৩৯ টাকা। অন্য দেশগুলোতে দাম ভিয়েতনামের চেয়েও বেশি। বর্তমানে ভিয়েতনামও আগের চেয়ে চালের দাম বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সংকট মেটাতে দুস্থদের খাদ্য কর্মসূচি ভিজিএফ খাতের চালের বরাদ্দ ৪ লাখ ২০ টন থেকে কমিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন করা হয়েছে। আবার বন্যাদুর্গত এলাকার বাইরে ভিজিএফ ও জিআর খাতে ত্রাণ বিতরণ ছাড়া সরকারি খাদ্যশস্য বিতরণ বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

Disconnect