ফনেটিক ইউনিজয়
পাঙাসের মজাদার আঁচার
মো. শাহীন সরদার

উৎপাদন ও ভক্ষণের দিক দিয়ে আমাদের দেশীয় বাজারে জায়গা করে নিয়েছে পাঙাস মাছ। ‘থাই পাঙাস’ দিয়েই এ দেশে পাঙাস চাষ শুরু হয়। কয়েক যুগের বিবর্তনে এক সময়ের ধনীর খাদ্য খেকে এই মাছটি পরিণত হয়েছে সাধারণের খাদ্যে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ মেট্রিক টন থাই পাঙাস উৎপাদন হয়। বৃহত্তর উৎপাদন ও স্বল্পমূল্যের পরও অতিরিক্ত চর্বি, আঁশটে গন্ধের কারণে দেশে জনপ্রিয়তা হারানোর পাশাপাশি বিদেশযাত্রায় সুবিধা করে উঠতে পারেনি এই পাঙাস মাছ। ফলে ইদানীংকালে খামারিদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। পাঙাসের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে বিকল্প ব্যবহার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অ্যাকোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম তৈরি করেছেন পাঙাস যোগে হরেক রকমের আঁচার। তাঁর কাছ থেকেই জানতে চেষ্টা করব, কীভাবে এই আঁচার তৈরির ধারণা এল, সেই সঙ্গে জানা যাবে আঁচারের রেসিপিটাও।
সাম্প্রতিক দেশকাল : কীভাবে আঁচার তৈরির ধারণা এল?
অধ্যাপক ড. সালাম: আবহমান কাল থেকে এই উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের মানুষ বিভিন্ন ধরনের ফলের আঁচার তৈরি করে আসছে। তবে আমাদের দেশে মাছের আঁচারের প্রচলন তেমন একটা নেই বললেই চলে। ২০০৯ সালে ময়মনসিংহের চাষিরা যখন মাছের যথাযথ দাম না পেয়ে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন, তখন আমি চাষিদের রক্ষার জন্য কিছু একটা করার চিন্তা করতে থাকি। এমনই একসময় আমার গবেষণার পুকুরে প্রচুর ছোট ছোট বেলে মাছ পাই। এত ছোট মাছ দিয়ে কী করা যায় ভেবে পাচ্ছিলাম না।  পরীক্ষামূলকভাবে ওই ছোট বেলে মাছ দিয়ে আঁচার-জাতীয় কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নিই। পরে তা পাঙাসের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করি।
সা. দে : পারিবারিক সহযোগিতা কেমন ছিল?
ড. সালাম : প্রথমে স্ত্রী ও দুই মেয়ে এই কাজকে পাগলামো বলে ভর্ৎসনা করে। কিন্তু পরে তারাও খুব আগ্রহ সহকারে আমাকে এ কাজে সাহায্য করতে থাকে। এই আঁচার তৈরিতে আমি ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতা এবং ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়েছি। সত্যি সত্যি আঁচারটা যখন তৈরি হলো, তখন পরিবারের সবাই তা খুব পছন্দ করল। তবে তাদের কথা হলো, এই আঁচার যদি পাঙাস, বোয়াল, বাইম বা শোল-গজার মাছ দিয়ে করা হতো তবে তা হতো আরও মজাদার। তাদের কথামতো এক শুক্রবারে পাঁচ কেজি পাঙাস মাছ কিনে এনে শুরু করলাম পাঙাসের আঁচার তৈরির কাজ। এবার পরিবারের কেউ আমার এই আঁচার তৈরিকে পাগলামো বলেনি। বরং সবাই সহযোগিতা করেছে। পরিবারের সবাই এক বাক্যে পাঙাস মাছের আঁচারকে ‘মজাদার ও অতুলনীয়’ বলে অভিহিত করে।
সা. দে : আঁচারের সঙ্গে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করতেন?
ড. সালাম : আঁচার সম্পর্কে অন্যান্য মানুষের মতামত নেওয়ার জন্য প্যানেল টেস্টের চিন্তা করলাম। আমি বাকৃবির তৎকালীন উপাচার্য এম এ সাত্তার ম-লকে আঁচারটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য বলি। তিনি আঁচারের খুব প্রশংসা করেন। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক ম-ল নবম সংসদে কৃষির ওপর আলোচনা করতে গিয়ে পাঙাস মাছের আঁচারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ‘নব-উদ্ভাবন’ বলে অভিহিত করেন।
সা. দে : পাঙাস মাছের আঁচার ছাড়াও অন্য কোনো আঁচারের রেসিপি চেষ্টা করেছেন কী?
ড. সালাম : আমি হাওড়ের বোয়াল ও গুচি বাইম মাছ দিয়েও আঁচার তৈরি করে ভালো ফল পেয়েছি। কাঁটাযুক্ত ছোট মাছের আচার কিছুদিন ফ্রিজে রেখে দিলে ভিনেগারের জন্য কাঁটাগুলো নরম হয়, ফলে কাঁটাসহ আঁচার খাওয়া যায়। আমি পাঙাসের চাটনিও তৈরি করেছি এবং প্যানেল টেস্টে সেটাও ‘ভালো ও টেস্টি’ হিসেবে বিবেচিত হয়। মাছের আঁচার ও চাটনি তৈরির পর আমি ফুলকপি ও করোলার আঁচারও তৈরি করি, যা খুবই মজাদার ও সুস্বাদু ছিল।
সা. দে : পাঙাসের আঁচার তৈরির রেসিপি সম্পর্কে কিছু বলুন।  
ড. সালাম : পাঙাস মাছের আঁচার তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো ১) কাঁটাছাড়া পাঙাস মাছের ছোট ছোট টুকরো এক কেজি, ২) ৫-৬ চা চামচ শুকনো মরিচ গুঁড়া, ৩) ২ চা-চামচ হলুদ গুঁড়া, ৪) সরিষার তেল ৪০০ মিলি ৫) ২ চা-চামচ সরিষা, ৬) ২ চা-চামচ মেথি, ৭) ২-২৫ কাপ পেঁয়াজ কুচি, ৮) ৪ চা-চামচ আদাবাটা ও ১/২ কাপ আদা কুচি, ৯) ৪ চা-চামচ রসুনবাটা ও ১/২ কাপ রসুন কুচি, ১০) ৪-৫টা কাঁচা মরিচ ফালি এবং ১১) ১-১৫ কাপ ভিনেগার।
প্রথমেই আঁচার তৈরির জন্য তাজা পাঙাস মাছ নিয়ে কাঁটা ফেলে এক সেন্টিমিটার আকারের ছোট ছোট টুকরো করে কাটতে হবে। মাছ কাটা হলে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে ১ কেজি মাছের মধ্যে ১ চামচ হলুদ গুঁড়া, ২ চামচ মরিচ গুঁড়া, পরিমাণমতো লবণ মিশিয়ে দেড় থেকে ২ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। এরপর মাছের টুকরো সসপেন বা কড়াইতে অল্প সরিষার তেলে ভাজতে হবে। খুব কড়া করে ভাজার প্রয়োজন নেই। এবার কড়াইয়ে ২ কাপ পরিমাণ সরিষার তেল নিয়ে গরম করে তাতে ২ চা-চামচ সরিষা দিয়ে না ফোটা পর্যন্ত নাড়তে হবে। পরবর্তীতে ২ চা-চামচ মেথি দিয়ে অল্প সময় নাড়ার পর পেঁয়াজ কুচি ভেজে লাল করতে হবে। এবার ৪-৫ চা-চামচ করে আদাবাটা, রসুনবাটা ও ৪ চা-চামচ শুকনা মরিচবাটা এবং ৪-৫টা কাঁচা মরিচ ফালি দিয়ে কড়া করে ভাজতে হবে। মসলা ভাজার শেষ পর্যায়ে আধা কাপ করে আদা ও রসুন কুচি দিয়ে আরও কিছুক্ষণ ভাজতে হবে। মসলাগুলো ভালোমতো ভাজা হলে ভাজা মাছগুলি তাতে ঢেলে দিয়ে ১৫-২০ মিনিট অল্প আঁচে নাড়তে হবে। প্রয়োজন হলে আরও তেল দিতে হবে যাতে মাছের টুকরো তেলের নিচে ডুবে থাকে। এবার চুলা বন্ধ করে লবণ চেখে নামাতে হবে। এরপর এক থেকে দেড় কাপ ভিনেগার দিয়ে টুকরোগুলো নেড়ে রেখে দিতে হবে। ঠান্ডা হলে কাঁচের বয়ামে ভরে রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন কৌটার ভেতর মাছ ভরার পর মাছের ওপর তেল ভেসে থাকে।
সা. দে : কতদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে?
ড. সালাম : এটাকে ফ্রিজে রেখে ৬ মাস পর্যন্ত খাওয়া যায়।
সা. দে : এই আঁচার কিসের সঙ্গে খেতে পারি?
ড. সালাম : এই আঁচার পোলাও, খিচুড়িসহ আলুভর্তা, ডাল ও ভাতের সঙ্গে খুব মজা করে খাওয়া যায়। আমার মেয়েরা সকালে পরোটা দিয়ে এই আঁচার খুব মজা করে খায়। তা ছাড়া বিকেলের নাশতা হিসেবে মুড়ির সঙ্গে মাখিয়েও খাওয়া যায় এই আঁচার।
সা. দে : ভোক্তাদের মাঝে জনপ্রিয় করতে পারলে এর ভবিষ্যৎ কেমন হবে বলে আপনি মনে করছেন?
ড. সালাম : বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাঙাসের আঁচার উৎপাদন করা হলে চাষিরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। তা ছাড়া যাঁরা পাঙাস মাছ খেতে পছন্দ করেন না, তাঁরাও এই আঁচার খেতে পারবেন। তা ছাড়া সমুদ্র উপকূল বা হাওর-বাঁওড়ে যখন বেশি বেশি মাছ পাওয়া যায়, সেসব অঞ্চলে মাছের আঁচার তৈরির কুটিরশিল্প গড়ে উঠতে পারে, যা দেশে শুধু নতুন কর্মসংস্থানই করবে না, উৎপাদিত আঁচার দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

Disconnect