ফনেটিক ইউনিজয়
বি শে ষ সা ক্ষা ৎ কা র ৮
‘কীভাবে একটা ভেঙে যাওয়া গল্প বলতে হয়? ধীরে ধীরে সমগ্রে পরিণত হওয়া। না। ধীরে ধীরে সবকিছুতে পরিণত হওয়া’
অরুন্ধতী রায়

গত ২০ জুন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন অনুষ্ঠান ‘ডেমোক্রেসি নাউ’র সঙ্গে খ্যাতিমান ভারতীয় লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকারটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে সাম্প্রতিক দেশকাল-এ। আজ প্রকাশিত হলো এর অষ্টম পর্ব। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন রক্তিম ঘোষ
নেরমীন শেখ : বেশ, এই বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে, আপনি আরও খ্যাতির প্রত্যাশা করতে পারেন, কারণ এখনই এই বইটা কমপক্ষে তিরিশটা ভাষায় অনূদিত হতে চলেছে। আমি এবার যে প্রসঙ্গটা তুলব তা হলো, এই বইয়ের কিছু সমালোচকের কাছে মনে হয়েছে, অন্যান্য ভারতীয় ঔপন্যাসিক যাঁরা ইংরেজিতে লেখেন, তাঁদের লেখার সঙ্গে মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এর সাদৃশ্য থাকতে পারে। তবে আমাদের যেটা অবাক করেছে, আপনার লেখার সঙ্গে হয়তো উরুগুয়ের ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানোর মতো লেখকদের অনেক বেশি সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৫ সালে মারা গেলেন গ্যালিয়ানো। তাঁর মৃত্যুর দুই বছর আগে ২০১৩ সালে, ডেমোক্র্যাসি নাউ গ্যালিয়ানোর সঙ্গে আমাদের নিউইয়র্ক স্টুডিওতে কথা বলেছিল। চলুন ক্লিপটা দেখা যাক।
এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো : প্রথাগত শিক্ষা আমার নেই। আমি শিক্ষা পেয়েছি মন্তেভিদিও ক্যাফেতে। সেখানে আমি গল্প বলার প্রাথমিক পাঠ পেয়েছি। আমি খুব ছোট ছিলাম আর একটা টেবিলের ওপর বসতাম। যা লোকজন যেখানে বসত, সেই টেবিলগুলোর কাছেই থাকত। কম বা বেশি বয়সী মানুষ, যারা গল্প করত, আর আমি তাদের কথা শুনতাম, কারণ নামহীন ওই মানুষগুলো খুব ভালো গল্প করত।
আমাদের একটা টুকরো স্মৃতি থাকে। আর আমি লিখি আমাদের সত্যিকার স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য, মানবতার স্মৃতি, যেটাকে আমি বলি মানবিক রংধনু, যা অন্য রংধনুর চেয়ে অনেক বেশি রঙিন ও সুন্দর। কিন্তু মানবিক রংধনুর অঙ্গচ্ছেদ হয়েছে পুরুষতন্ত্র, বর্ণবাদ, সমরবাদ আর অন্যান্য আরও মতবাদের দ্বারা, যেগুলো নৃশংসভাবে আমাদের মহত্ত্বকে, আমাদের সম্ভাব্য মহত্ত্বকে, আমাদের সৌন্দর্যকে হত্যা করেছে।
নেরমীন শেখ : এই হলেন এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো, উরুগুয়ের লেখক, তিনি ২০১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
অরুন্ধতী রায় : হ্যাঁ, যাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।
নেরমীন শেখ : আর তাই, তাঁর সম্পর্কে, তাঁর ও আপনার লেখার সম্ভাব্য সাদৃশ্য সম্পর্কে আপনি কী আমাদের বলতে পারেন?
অরুন্ধতী রায় : বেশ, এদুয়ার্দো ভেঙে যাওয়া গল্পের ওস্তাদ ছিলেন, যদিও আমার মনে হয় না তিনি উপন্যাস লিখতেন। আমি যতদূর জানি, তিনি কখনো উপন্যাস লেখেননি। কিন্তু তিনি একটা সুন্দর বই লিখেছিলেন, যার নাম দ্য ওপেন ভেইনস অব লাতিন আমেরিকা। আর তাঁর যেটা ছিল তা হলো, আমার মনে হয়, জাদুবাস্তবতাবাদী না হয়েও বাস্তবতাকে জাদুময় করে তোলার কৌশল সম্ভবত তাঁর আয়ত্তে ছিল। কী অসাধারণ লেখক ছিলেন তিনি আর কী অসম্ভব দ্রষ্টা অসাধারণ।
অ্যামি গুডম্যান : দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস বইয়ের পেছনে আপনার একটা উদ্ধৃতি রয়েছে, ‘কীভাবে একটা ভেঙে যাওয়া গল্প বলতে হয়? ধীরে ধীরে সমগ্রে পরিণত হওয়া। না। ধীরে ধীরে সবকিছুতে পরিণত হওয়া।’ ‘ভেঙে যাওয়া গল্প’-এর মানে আর উদ্ধৃতিটা ব্যাখ্যা করুন।
অরুন্ধতী রায় : বেশ, ওটা আসলে তিলোর অনেকগুলো খাতার মধ্যে একটায় লেখা একটা ছোট্ট হিজিবিজি, তাই এটা উদ্ধৃত করা হয়েছে। এর অর্থ আমি কী বোঝাতে চেয়েছি? বেশ, আমি যা বলতে চেয়েছি তা হলো, যেটা বিষয়ের শিরোনাম নয়, তেমন একটা গল্প বলার ক্ষমতা। একটা গল্প, যা সংযোগগুলোর দিকে তাকাতে ভয় পায় না। যেমনটা এদুয়ার্দো বলেছিলেন, নতুন যা উঠে আসছে, তার সঙ্গে কি কোনো সংযোগ আছে বৃহৎ অর্থনীতি, পারমাণবিক মহাশক্তি আর পুরুষতন্ত্রের? দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে কাশ্মীরে যা হচ্ছে, নারীদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হচ্ছে, তার কী কোনো সংযোগ আছে? আমি বলতে চাইছি যে, আমরা এমন একটা সমাজে বাস করি, যেটা জাতিভেদ অনুশীলন করে। এখানে ক্রমোচ্চ শ্রেণি বিভাগের সর্বাপেক্ষা সংগঠিত চেহারা কোনটা? আর হ্যাঁ, অল্প কিছু লোকই এটা নিয়ে লিখবেন। এটা অনেকটা যেখানে জাতিবিদ্বেষ ছিল, এটা বাদ দিয়ে জাতিবিদ্বেষী দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে লেখার মতো। কিন্তু নারীদের সঙ্গে যেমন আচরণ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে এখানে আমি যে বিষয়গুলো বললাম, তার সংযোগ কোথায়? আপনি যদি এমন সব বই লেখেন, যেখানে প্রতিটাই হলো বিষয়ের শিরোনাম, এটা হবে এক কেতাবি সাংবাদিকতা। তিনি (গ্যালিয়ানো) যে রংধনুর কথা বলছেন, এর মাধ্যমে আপনি সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না, অবশ্যই কখনো কখনো দেখতে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দরটাকেও না। এটাই আমি বলতে চেয়েছি।
এটা সেই বায়ুকে তৈরি করে, যা দিয়ে আমরা শ্বাস নিই। আর তাই এটা একটা ভেঙে যাওয়া গল্প। আসলে যদি আপনি সেই বায়ুতে শ্বাস নিতে চান, আপনি যা যা জানেন, আপনাকে তার সবকিছু হতে হবে। যে ঘটনা থেকে সম্ভবত আমি সবথেকে গভীর রাজনৈতিক শিক্ষা নিয়েছি, সেটা হলো নর্মদা রক্ষার আন্দোলন থেকে। বড় বাঁধগুলো নদীর সঙ্গে, সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে, মাছেদের সঙ্গে কী করে, সে সম্পর্কিত বোঝাপড়া থেকে। এটা শুধু মানুষ, অগ্রগতি আর উন্নয়নের বিষয় নয়, বরং একটা মন যা নদীর দিকে তাকায় আর চিন্তা করে, তারই বিষয়। একটা নদী, যা সভ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ‘আমি অবশ্যই টনের পর টন সিমেন্ট এখানে ঢালব’, পানির কেন্দ্রীকরণ করা যেতে পারে, আর একবার কেন্দ্রীকরণ হয়ে গেলে, এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, আর একবার এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে, যারা এর পারে বাস করে ফসল ফলায়, সেসব মানুষকে বাদ দিয়ে এই জল দিয়ে দেওয়া যাবে হোটেল ব্যবসায় কিংবা গলফ কোর্সে। আপনি কি এটাকে উন্নয়ন বলতে পারেন? তাই আপনাকে সেই নদীটাও হতে হবে। চলবে...

Disconnect