ফনেটিক ইউনিজয়
ভারতনির্ভরশীলতাই ভোগান্তির কারণ!
পেঁয়াজের ঝাঁজে অস্থির পণ্যবাজার
ইমদাদ হক

পেঁয়াজের উৎপাদন ও চাহিদা নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে প্রতিবছর পেঁয়াজ লাগে ২০ থেকে ২২ লাখ টন। আর উৎপাদন হয় ১৭ লাখ টন। ঘাটতি ও চাহিদার এই ফারাক কয়েক বছর ধরে একই আছে। আর ঘাটতি মেটাতে তাই ভরসা, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ। প্রশ্ন জেগেছে, ভারতের ওপর এই নির্ভরশীলতাই কি ভোগান্তির নেপথ্য কারণ?
বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ে অস্থিরতা বেশ কিছুদিন ধরেই। এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম হয়েছে দ্বিগুণ। মাত্র দুই-তিন মাস আগেও কেজিতে পেঁয়াজের দর ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকায়। এখনো দর একই আছে, তবে কমেছে পরিমাণ। অর্থাৎ এক হালি পেঁয়াজ মিলছে আগের মূল্যে। আর কেজিতে পেঁয়াজের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। এই দর, তা-ও আবার ভারতীয় পেঁয়াজের, দেশি পেঁয়াজ দামের সূচকে আরও উঁচুতে থেকেছে বেশির ভাগ সময়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকা অনুযায়ী, এক মাসে বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৭১ শতাংশ। এক বছর আগে এক কেজি পেঁয়াজের দাম ২০ থেকে ৩৫ টাকা ছিল বলে জানায় সংস্থাটি। একটি পরিবারে মাসে গড়পড়তা পাঁচ কেজি পেঁয়াজ লাগে। দেশি পেঁয়াজের ক্রেতারা এক বছর আগে যে পেঁয়াজ কিনেছিলেন ১৭৫ টাকায়, সেই পেঁয়াজ কিনতে এখন ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪২৫ টাকা।
হঠাৎ দাম বাড়ার কারণ উঠে আসে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) ও ইউএসএআইডির প্রতিবেদনে। তাদের গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, চাহিদামতো পেঁয়াজ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের। কেবল চাহিদা পূরণই নয়, পেঁয়াজ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও হাতের নাগালে। কিন্তু যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় চাহিদামতো পেঁয়াজ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে এ জন্য সরকারি নীতিকে প্রধানভাবে দায়ী করা হয়েছে। আর হাত বাড়ালেই মেলে ভারতীয় পেঁয়াজ, বড় কোনো ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই। তাই অনেকটাই গা ছাড়া ভাব সরকারের। অতিমাত্রায় ভারতনির্ভরতা পেঁয়াজের উৎপাদন না বাড়ানোর পেছনে মুখ্য কারণ।
ভারতনির্ভরশীলতার এই তথ্য উঠে আসে রাজধানীর ব্যবসায়ীদের বক্তব্যেও। রাজধানীর আমতলি, কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, বছর শেষে ভারতের পেঁয়াজ সরবরাহ কমে যায়। এমন ঘটনা প্রায় প্রতিবছরই ঘটে। এই সময়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয়। ঘাটতি পূরণের আর কোনো উৎস না থাকায় বেশি দরেই পেঁয়াজ কেনেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। যার প্রভাব পড়ে খুচরা ক্রেতাদের ওপরও। তবে এবার যেমন আগাম বন্যা নষ্ট করে দিয়েছে দেশের কৃষি খাতের বড় একটি অংশ। একই অবস্থা প্রতিবেশী দেশেরও। দক্ষিণ ভারতে বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের ফলন এবার কম হয়েছে। তা ছাড়া নাসিকের পেঁয়াজের মৌসুম এখনো শুরু হয়নি। ফলে চড়ামূল্যে ভারত থেকে আমদানি করতে হচ্ছে পণ্যটি, যা স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, সর্বশেষ ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩ লাখ ৯ হাজার একর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল নয় লাখ টনেরও বেশি। সে সময় একরপ্রতি ফলন পাওয়া যায় প্রায় তিন টন। এরপর কয়েক বছর বেড়েছে পণ্যটির উৎপাদন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ৭৩ হাজার একর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন ছিল ১৩ লাখ ৮৭ হাজার টন। অর্থবছরটিতে একরপ্রতি ফলন ছিল ৩ দশমিক ৭১ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৪ লাখ ১৯ হাজার একর জমিতে পণ্যটি উৎপাদন হয় ১৭ লাখ ৪ হাজার টন। এরপর উৎপাদন বৃদ্ধির এ গতি আর ধরে রাখা যায়নি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ৩৮ হাজার একর জমিতে পেঁয়াজ পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টন। একরপ্রতি ফলনও কমে আসে চার টনের নিচে।
ইফপ্রি এবং ইউএসএআইডির গবেষণাপত্রে বলা হয়, কৃষকেরা যে পদ্ধতিতে উৎপাদন করেন, তার আধুনিকায়ন প্রয়োজন, দরকার তাঁদের প্রশিক্ষণও। আর যে বীজ সরবরাহ করা হয়, তার মানও সর্বোচ্চ ফলনের উপযোগী নয়। কৃষক প্রশিক্ষণ ও বীজ-সংকট কাটাতে তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুপারিশও ছিল তাঁদের।
ইফপ্রির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আকতার আহমেদ বলেন, পেঁয়াজের উৎপাদন না বাড়ানোয় আমদানির ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। আর আমদানির জন্যও একক মার্কেটকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলকভাবে পছন্দ করার মতো অপশন থাকছে না। আবার আমদানির এমন ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করছেন একশ্রেণির সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। এমন অবস্থায় পেঁয়াজের বাজার অস্থির হওয়ার যথেষ্ট অনুষঙ্গ বাজারে বিদ্যমান। যার নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত হবেন খুচরা ক্রেতারা।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমদানি বাজার বহুমুখী করার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরাও। তাঁরা বলেন, চীন, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, মিসর, মালয়েশিয়া ও তুরস্কের বাজারে প্রবেশ বাড়াতে হবে।
বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানি বাড়ানোর পক্ষে মত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) শামীমা ইয়াসমিনেরও। তিনি বলেন, দেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয় বেসরকারিভাবেই। সাধারণত সরকারিভাবে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। তবে চাহিদা মেটাতে সংকট সৃষ্টি হলে সরকার অবশ্যই ভাববে। প্রয়োজনে টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Disconnect