ফনেটিক ইউনিজয়
অব্যবস্থাপনার ৬০ বছর
সমস্যায় জর্জরিত পাবনা মানসিক হাসপাতাল
সনম রহমান

পাবনা মানসিক হাসপাতালে মঞ্জুরীকৃত চারটি শ্রেণির দেড় শতাধিক পদ যুগ যুগ ধরে শূন্য পড়ে থাকায় কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। আর এ নিয়ে রোগী ও তাদের অভিভাবকেরা জানিয়েছেন হতাশা। জনবলের অভাবে ছিনতাই, গুম, দুর্নীতি, ওষুধ পাচার, অনিয়মসহ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ৬০ বছরে ঘটে গেছে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।
১৯৫৭ সালে জুলাইয়ের প্রথম দিকে শীতলাই জমিদার বাড়িতে ৬০ শয্যাবিশিষ্ট মানসিক ব্যাধির একটি হাসপাতাল খোলা হয়। ১১ মাস পর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালের মে মাসে বর্তমান স্থানে হেমায়েতপুরে ১১১ একর জমিতে স্থানান্তরিত হয় হাসপাতালটি। ১৯৫৯ সালে ২০০ শয্যা এবং ১৯৬৭ সালে ৪০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এখানে প্রতিটি ওয়ার্ডে বিনোদনকক্ষ, উপদেষ্টা কক্ষ ও ভোজনকক্ষের ব্যবস্থা আছে। হাসপাতাল ভবন পরিবেষ্টিত ফাঁকা জায়গায় রোগীদের অভিভাবকের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য ছোট ছোট ১০টি কটেজ নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিটি কটেজে দুটি করে ঘর ও খাওয়ার, রান্না ও গোসলখানার ব্যবস্থা ছিল। এখন এসবই পরিত্যক্ত। ১৯৯৮ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী এই হাসপাতালকে ১০০ শয্যা বাড়িয়ে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। জনবল-সংকটের কারণে পাবনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপকেরা এ হাসপাতালে রোগী দেখছেন।
ভালো নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় ২০০৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাতে হাসপাতালে ডাকাতি হয়। ৩ লাখ টাকাসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার ওষুধ নিয়ে যায় ডাকাত দল। এর আগে ৪ লাখ টাকা দামের একটি ইসিজি মেশিন চুরি হয়। ২০০৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে ৮ লাখ টাকা সমমূল্যের ইনজেকশন উদ্ধার করা হয়। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট ও সেবা তত্ত্বাবধায়কের পদ শূন্য রয়েছে। প্যাথলজি ও জরুরি বিভাগহীন এ হাসপাতালে সাইকোসিস, নিউরোসিস, হিস্টেরিয়া ও বুদ্ধিহীনতা রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। বহির্বিভাগে ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন কয়েক শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। মহিলা ও পুরুষ চিকিৎসক আলাদাভাবে মাত্র এক ঘণ্টা রোগী দেখেন। যাঁরা রোগী নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বহির্বিভাগে পৌঁছাতে পারেন না, তাঁরা চলে যাচ্ছেন ক্লিনিকে। ১৯৮২ সালে পেইং বেড সিস্টেম চালুর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকটের সূত্রপাত করা হয়। ১২০টি পেইং বেডের মধ্যে অর্ধেকই খালি পড়ে থাকে ১০ বছর। নৈশপ্রহরীর পদও সৃষ্টি করা হয়নি। লোকবল সংকটের কারণে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন ওয়ার্ড বয়। অথচ ওয়ার্ড বয়দেরই ৩১টি পদ শূন্য।
জানা যায়, ১৯৯০ সালে পালিয়ে যাওয়া রোগীর সংখ্যা ৫১ জন। ১৯৯১ সালে ২৪ জন। ১৯৯৬ সালের মার্চে আরও ১০ জন রোগী পালিয়ে যান হাসপাতাল থেকে।
১৯৮৯ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে স্টাফদের বেতনের প্রায় ৫ লাখ টাকা তুলে হাসপাতালে যাওয়ার পথে জিপ থেকে টাকা রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়। সাজানো হয় ছিনতাই নাটক। কিছুদিন পর এই জিপ গাড়ির ড্রাইভার দিলজান নিখোঁজ হয়ে যান। এ ঘটনা সেপ্টেম্বর মাসের। আশির দশকে ১০ বছরে অন্তত ৭ বার চুরি হয়েছে রেকর্ড রুমে।
১৯৯৭ সালে ট্যাপের ময়লা পানি পান করে পেটের পীড়ায় পাঁচজন রোগী মৃত্যুবরণ করেন। অনেক রোগী ডিপ্রেশনে ভুগছেন। আত্মীয়স্বজন তাঁদের দেখতেও আসেন না, নিতেও আসেন না। বছরে গড়ে দুই-তিনজন করে রোগী আত্মঘাতী হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, আত্মহত্যার চিন্তাচেতনা মাথা থেকে দূর করার জন্য ইলেকট্রো কনভালসিভ থেরাপি প্রয়োগ করা হচ্ছে না।
২০০৩ সালের আগস্টে হাজার পাঁচেক নকল ইনজেকশন উদ্ধার করা হয়। যার নাম ফ্লুফেনাজাইল ডেকেনায়েট ওয়ান সিসি। এমনই আরও হাজারো সমস্যায় জর্জরিত এই হাসপাতাল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গড়ে প্রতিবছর বহির্বিভাগে ২০ হাজারের বেশি এবং অন্তর্বিভাগে প্রায় দেড় হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসাসেবা, ভর্তিকরণ, কাউন্সেলিং এবং গ্রুপ থেরাপি করা হয়। অন্তর্বিভাগে ১৫০টি রয়েছে পেয়িং বেড, এর মধ্যে পুরুষ ৭৫টি, নারী ৫০টি। মাদকাসক্ত ২৫টি। এ ছাড়া ৩৫০টি রয়েছে নন-পেয়িং বেড। পুরুষের জন্য ২৭৫টি ও নারীদের জন্য ৭৫টি।

যেসব পদ শূন্য
পাবনা মানসিক হাসপাতালে মঞ্জুরীকৃত ৪টি শ্রেণির ৫৪১টি পদের মধ্যে ১৯ জন কর্মকর্তাসহ ১৫৮টি পদ শূন্য। ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্টের ১টি পদ সৃষ্টির পর থেকেই শূন্য রয়েছে। সেবা তত্ত্বাবধায়কের পদটিও প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই শূন্য। ৫৪ বছর ধরে শূন্য মেডিকেল অফিসার ও ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের ৮টি পদ। শ্রেণিভিত্তিক পদবিন্যাসের মধ্যে প্রথম শ্রেণির (চিকিৎসক) ৩০টি পদের মধ্যে মাত্র ১৪ জন রয়েছেন কর্মরত। প্রথম শ্রেণির (অন্যান্য বিভাগের) ৭টি পদের মধ্যে ৩টি পদ খালি। দ্বিতীয় শ্রেণির ২১৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৮৩ জন। তৃতীয় শ্রেণির ১১৯টি পদের মধ্যে ৭৯টি পদই খালি পড়ে আছে।
এ ছাড়া সহকারী রেজিস্ট্রারের ৩টি পদের ৩টিই শূন্য। সিনিয়র কনসালট্যান্টের ২টি পদে ২টিই শূন্য। ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট, আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট, ডেন্টাল সার্জন, অ্যানেসথেটিস্ট, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট, ক্লিনিক্যাল, সাইকোলজিস্ট এবং এসএলপিপির একটি করে পদ থাকলেও তা শূন্য রয়েছে। স্টেনোগ্রাফার, ক্যাশিয়ার, সহকারী শরীরচর্চা প্রশিক্ষক, লন্ড্রি সুপার ভাইজার ও টেইলারের পদ খালি পড়ে আছে বছরের পর বছর। মানসিক হাসপাতাল মসজিদের জন্য মঞ্জুরীকৃত ইমামের পদটিও শূন্য পড়ে আছে। ইইজি টেকনিশিয়ান, টেলিফোন অপারেটরের পদও খালি আছে। ওয়ার্ড বয়ের ৩১টি পদ শূন্য। কর্মরত আছে ৩৯ জন। সুইপারের পদ খালি রয়েছে ১৩টি। কর্মরত আছে ১৭ জন।
হাসপাতালে রোগীদের দিনের বেলা বিনোদনমূলক চিকিৎসা বিভাগ আছে। এই বিভাগে ইনডোর ও আউটডোর খেলার বন্দোবস্ত আছে নামকাওয়াস্তে। পাক্ষিক বিচিত্রানুষ্ঠান করা এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থারও একই অবস্থা।

Disconnect