ফনেটিক ইউনিজয়
ভয়ংকর গ্যাং কালচার, ফের গরম উত্তরা
এ আর সুমন

ফিল্মি স্টাইলে যেন নগরে বেড়ে চলেছে কিশোর অপরাধ চক্র বা নয়া ‘গ্যাং কালচার’। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়ংকর হয়ে উঠেছে এসব কিশোর অপরাধী। তারা হরেক রকমের নাম দিয়েছে নামি-বেনামি অসংখ্য গ্যাং চক্রের। প্রায় ঘটছে হানাহানি। অনেকে ব্যবহৃত হচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের হাতিয়ার হিসেবে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি থেকে খুন-খারাবি পর্যন্ত গড়িয়েছে ঘটনা। তবে এসব চক্রের মধ্যে বর্তমানে বেশি আলোচনায় রয়েছে উত্তরাকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি গ্যাং। কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও ফের গরম হয়ে উঠেছে এসব চক্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি ব্যবস্থা না নিলে তা বড় রকমের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি উত্তরায় স্কুলছাত্র আদনান কবীর হত্যাকাণ্ডের পর দেশব্যাপী এই কিশোর অপরাধ চক্র আলোচনায় আসে। দুটি গ্যাংয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের জের ধরে আদনান খুন হয়। গ্যাং দুটি হলো ‘নাইন স্টার’ ও ‘ডিসকো বয়েজ’ গ্রুপ। নাফিস নামের প্রধান আসামি ছিল ডিসকো বয়েজ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। আদনান নাইন স্টার গ্রুপের।
উত্তরায় গত আগস্টের শেষের দিক থেকে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রভাবশালী এসব গ্যাং চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চলছে তাদের পাল্টাপাল্টি হুমকি-ধমকি। কয়েক সপ্তাহ ধরে তার বেশ কিছু নমুনা ফেসবুকে দেখা গেছে, এমনকি তা ভাইরাল হয়ে আলোচনায়ও এসেছে। ১০ অক্টোবর ‘নাইন স্টার বয়েজ উত্তরা’র পেজ থেকে স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে, ‘হোয়াটস আপ পিপল? গেজ হোয়াট, নাইন স্টার (উই) আর ব্যাক অ্যাগেইন একই দিন অর্থাৎ ১০ অক্টোবর আদনান হত্যাকাণ্ডে আটকদের ছবি প্রকাশ করে ‘নাইন স্টার বয়েজ উত্তরা’। ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে; ছোড়েঙ্গে দম মাগার তেরা সাথ না ছোড়েঙ্গে’। ১৬ অক্টোবর একই গ্রুপের পেজ থেকে ‘ডিসকো বয়েজ উত্তরা’ গ্রুপকে উদ্দেশ করে লেখা হয়েছে, ‘এলাকার গোলির কুত্তারা মিল্লা বানাইছে এক গ্যাং, তার নাম নাকি আবার ডিসকো।’ উল্লেখ্য, আদনান হত্যা মামলার আসামি নাফিজ আলম ডন জামিনে রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর সে তার ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে লিখেছে, ‘আই ডোন্ট টক মাচ, আই জাস্ট পুল দ্য ট্রিগার’।
এ প্রসঙ্গে আদনান হত্যা মামলায় তদন্তের দায়িত্বে থাকা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক জানান, ‘জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে লক্ষ্যে আমরা স্কুল কলেজগুলোতে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম নিয়মিত করছি। আশা করি, এতে সুফল পাওয়া যাবে।’ উত্তরায় নতুন করে কিশোররা গ্যাং কালচার শুরু করেছে এমন কোনো তথ্য তার কাছে নেই বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এবার আসা যাক অন্যান্য এলাকার কিশোর গ্যাংদের বিষয়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তরা ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০টির মতো ছোট-বড় গ্যাং। যার মধ্যে রয়েছে কাকরা গ্রুপ, জি ইউনিট গ্রুপ, ব্ল্যাক রোজ গ্রুপ, রনো গ্রুপ, কে নাইট গ্রুপ, ফিফটিন গ্রুপ, ডিসকো বয়েজ গ্রুপ, নাইন স্টার গ্রুপ, নাইন এম এম বয়েজ গ্রুপ, পোঁটলা বাবু গ্রুপ, সুজন গ্রুপ, আলতাফ গ্রুপ, ক্যাসল বয়েজ গ্রুপ ও ভাইপার গ্রুপ। গত দুই বছরে এসব গ্যাং সংগঠিত হয়ে নাম দিয়েছে ‘ফিফটিন গ্রুপ’। জানা গেছে, উত্তরা, পুরান ঢাকা, ওয়ারী, মিরপুর ও গুলশানের মতো এলাকায় সবচেয়ে বেশি কিশোর অপরাধী রয়েছে। পুরান ঢাকায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ উঠতি বয়সীদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। গুলশান বিভাগের বনানী থানাভুক্ত মহাখালী, দক্ষিণপাড়া, সাততলা বস্তি, কড়াইল বস্তি ও আশপাশ এলাকায় শতাধিক কিশোর অপরাধীর দৌরাত্ম্যে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, ভাসানটেক, শাহআলী থানা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন শতাধিক কিশোর অপরাধী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এসব বখাটে মূলত তিনটি কারণে বিপথে যাচ্ছে, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, আকাশ সংস্কৃতি ও মিডিয়ায় দেখানো নৃসংশতা। এলাকায় তুচ্ছ ঘটনায় সদলবলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয় এসব কিশোর চক্র। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুচর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের। যে যত ভয়ংকর, তার হাতেই উঠে আসছে উন্নত মানের অস্ত্র। বিভিন্ন মহল্লায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি থেকে শুরু করে ছিনতাই-রাহাজানির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে এরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবার আগে পরিবার থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। মা-বাবার সঠিক নির্দেশনা পেলে ছোট থেকে একটা শিশু ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। আর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সমস্যা থাকলে তার প্রভাব শিশুদের মাঝে পড়ে।
মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধেরও ধরন পাল্টেছে। তারা প্রযুক্তি দেখে সেটার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। আর উত্তরায় যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে দেখা যায়, এরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, মাদকাসক্ত। ফলে তাদের মধ্যে নিষ্ঠুরতা বেশি। তারা যা ইচ্ছে, তা-ই করছে। প্রযুক্তির সুফল তারা নিতে রাজি নয়, নেতিবাচক প্রভাব কী আছে, সেগুলোই গ্রহণ করছে এলাকাভিত্তিক এসব বখাটে। তবে তাদের বিষয়ে সমাজ, আইন আর পরিবারকে সমান ভূমিকা পালন করতে হবে এখনই, না হলে আরও ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে এসব কিশোর গ্যাং।

Disconnect