ফনেটিক ইউনিজয়
ইউপিডিএফে ভাঙন : ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের আশঙ্কা পাহাড়ে
সমির মল্লিক
ইউপিডিএফের প্রতিবাদ সমাবেশ। ছবি : সমির মল্লিক
----

অরণ্য আর সবুজ বনভূমির পার্বত্য অঞ্চল। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর সঙ্গে রাষ্ট্রের চরম অনৈক্য ছিল। রক্ত ঝরেছে সবুজ পাহাড়ে। পাহাড়ের প্রবাহিত হিংসার স্রোতোধারার অবসান হয় ১৯৯৭ সালে। ‘শান্তিচুক্তি’ হওয়ার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি এখনো সুদূরপরাহত। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে দিন দিন বাড়ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ‘শান্তিচুক্তি’র বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রসীত বিকাশ খীসা, সঞ্চয় চাকমার নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) আত্মপ্রকাশ ঘটে। দলটি ‘শান্তিচুক্তি’কে ‘আপসের চুক্তি’ বলে উল্লেখ করে। পরবর্তী সময়ে সন্তু লারমা ও প্রসীতের নেতৃত্বে দুই সংগঠনের আধিপত্য রক্ষার লড়াই চলছিল। মূলত দুই পক্ষের ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে শত শত নেতা-কর্মী নিহত হন। বহু গুম, অপহরণের অভিযোগও উঠেছে এ দুই পক্ষের বিরুদ্ধে।
পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন এবং বড় আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) থেকে ২০০৮ সালে প্রবীণ নেতা সুধা সিন্ধু খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএস (এমএন লারমা)। দলটি খাগড়াছড়িকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রলয় ও প্রভাব গড়ে তোলে। শুরু হয় জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং জেএসএস (এমএন লারমা) ত্রিমুখী সংঘর্ষ। রাঙামাটি ও বান্দরবানে জেএসএসের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও খাগড়াছড়িতে এই ত্রিপক্ষীয় সংঘাতে জেএসএস অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। খাগড়াছড়ির লাগোয়া লংগদু এবং বাঘাইছড়িতে জেএসএস এবং জেএসএসের (এমএন লারমা) মধ্যে সর্বাধিক সংঘাত হয়। এরই জের ধরে রাঙামাটির লংগদুতে নিহত হন অবিভক্ত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) সাবেক নেতা ও জেএসএস (এমএন লারমা) নেতা সুদীর্ঘ চাকমা।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে তিন দলের বিভাজন-দ্বন্দ্বে শঙ্কিত পাহাড়ের সাধারণ মানুষ। পাহাড়ে চলমান ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬ শতাধিক মানুষ। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। তবে দুই বছর ধরে অলিখিত মতৈক্যে সেই সংঘাত অনেকটায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে এতে স্বস্তি ফিরে এসেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
গত ১৫ নভেম্বর ইউপিডিএফের একাংশ সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করে ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ করে। তপন জ্যোতি চাকমাকে আহ্বায়ক ও জলেয়া চাকমাকে সদস্যসচিব করে ১১ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠার ১৯ বছর পর প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন দলটি প্রথমবারের মতো বিভক্ত হলো। ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা) সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করেন, ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দলটি গড়ে উঠলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ আদর্শচ্যুত হয়েছে। এরই প্রতিবাদে ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা সঞ্চয় চাকমা, দিপ্তী শঙ্করসহ অনেকে দল ত্যাগ করেছেন। এমনকি দল ছাড়ার পর অনেক নেতা-কর্মীকে মেরে ফেলা হয়েছে। গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, বলপ্রয়োগের রাজনীতি, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও অপহরণের রাজনীতি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের জাতীয় দিবস বর্জনের রাজনীতি, এমনকি অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপে প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রতিরোধের চেষ্টার রাজনীতি করে যাচ্ছে ইউপিডিএফ।’
নতুন দলের আত্মপ্রকাশে আবারও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে  নবগঠিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) কমিটিকে রাষ্ট্রীয় মদদে ‘নব্য মুখোশ বাহিনী’ আখ্যায়িত করে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ খাগড়াছড়িতে লাঠি মিছিল ও প্রতিরোধ সমাবেশ করেছে। সমাবেশে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিককে ‘শায়েস্তা করার’ ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে ভাঙনের মাত্র চার দিনের মাথায় খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে দুই দল সংঘর্ষে জড়ায়। এ ছাড়া পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রত্যুত্তর চাকমাকে অপহরণের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করে ইউপিডিএফ। সমাবেশে ইউপিডিএফ-কে (গণতান্ত্রিক) ‘রাষ্ট্রীয় মদদে সৃষ্ট’ বলে এবং বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে বলে অভিযোগ করেন ইউপিডিএফ নেতারা। মূলত নতুন বিভাজনের ফলে এ মুর্হূতে পাহাড়ের চারটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা আরও তীব্র হলো।

আরো খবর

Disconnect