ফনেটিক ইউনিজয়
একজন স্বপ্নসারথির বিদায়
জাহিদুর রহমান

এই তো সেদিন ঢাকার (উত্তর) মেয়র হলেন তিনিÑস্বপ্ন দেখেছিলেন ঢাকা হবে কল্লোলিনী তিলোত্তমা। নগরবাসীও দেখেছিল সেই স্বপ্ন। মাত্র আড়াই বছরে এমন স্বপ্নযাত্রা সফল করা সম্ভব নয়। তবে তিনি যে তা করতে পারতেন, তেমন বিভিন্ন দৃষ্টান্ত আর উদ্যোগের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন ঢাকাবাসীর প্রিয়তম নগরপিতা। চার শ বছরের ঢাকায় আনিসুল হকের আগে সম্ভবত অন্য কোনো নগরপিতা জনপ্রিয়তার এমন চূড়া স্পর্শ করতে পারেননি, তাঁর শেষযাত্রায় নগরের আপামর মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিই নীরবে প্রতিষ্ঠিত করে এই সত্য।
গত শনিবার বিকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হকের দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর দ্বিতীয় জানাজা। এ সময় তাঁর ছেলে নাভিদুল হক সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, তাঁর বাবা ছিলেন একজন শৌখিন মানুষ। তিনি সব সময় ভালো কাজ করার চেষ্টা করেছেন। সততার সঙ্গে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। কাজ করতে গিয়ে তিনি যদি কারও মনে কষ্ট বা দুঃখ দিয়ে থাকেন, সেসব ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান নাভিদুল। বনানী কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবর রয়েছে প্রয়াত মেয়রের মা, শাশুড়ি ও প্রিয় সন্তান শারাফুল হকের। সন্তানের পাশের কবরেই দাফন করা হয় অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠা আনিসুল হককে।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মেয়র নির্বাচিত হন জনপ্রিয় উপস্থাপক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক। নগরীর উন্নয়নে নাগরিকবান্ধব বিভিন্ন ভূমিকার মধ্য দিয়ে আলোচিত হন তিনি। বিভিন্ন নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত, বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়া এই মহানগরের একটা অংশের নাগরিকদের মনে তিনি বিরাট আশার সঞ্চার করেছিলেন। এই মহানগর নিয়ে তাঁর একটা সুন্দর স্বপ্নদৃষ্টি ছিল এবং সেটা তিনি নগরবাসীর মনে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন। নগরবাসী আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় অনেক সমস্যার সমাধান হবে, মহানগরের বাসযোগ্যতা ক্রমে বাড়বে, একদিন এই মহানগর সুন্দর হয়ে উঠবে। মহানগরের উত্তর অংশের কদর্য বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য আন্তরিকভাবে তৎপর হয়ে ওঠেন আনিসুল হক। তাঁর অসাধ্য সাধনের একটি দৃষ্টান্ত তেজগাঁও এলাকার ট্রাকস্ট্যান্ডের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানবাহন চলাচল সুগম করা, যা এর আগে কোনো মেয়রের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি গাবতলীর সড়কের বিশৃঙ্খলাও অনেকটাই দূর করেছেন, গুলশান-বারিধারা এলাকার চেহারা বদলে দিয়েছেন, বিমানবন্দর সড়কের দুই পাশের দেয়াল সরিয়ে দিগন্ত খুলে দিয়েছেন, যানজট নিরসনের জন্য উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাটের বাধাবিঘœ সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আনিসুল হক পথচারী নাগরিকদের কথা ভেবে ফুটপাতগুলো থেকে ভাসমান দোকানপাট সরিয়ে সেগুলো হেঁটে চলার উপযোগী করার প্রচেষ্টাও চালিয়েছিলেন। যদিও সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতাসহ বিভিন্ন কারণে মেয়র আনিসুল হকের সব প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি, তবু এটা সুস্পষ্ট যে, তাঁর আন্তরিকতায় ঘাটতি ছিল না।
স্বপ্নের কারিগর ছিলেন আনিসুল হক। স্বপ্ন দেখতেন ঢাকাকে অন্যতম বাসযোগ্য নগরী করে গড়ে তোলার। সে পথেই হাঁটছিলেন সবার প্রিয় মেয়র আনিসুল হক। সব বাধা পেরিয়ে ঢাকাকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মৃত্যুঝড় থামিয়ে দিল তাঁর সব পরিকল্পনা।
বেশ কয়েক মাস আগে থেকে তিনি মাথায় যন্ত্রণা বোধ করছিলেন। বাংলাদেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করিয়েছিলেন। যদিও চিকিৎসকেরা কিছু ধরতে পারেননি। গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান আনিসুল হক। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লন্ডনে ন্যাশনাল নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মস্তিষ্কের রক্তনালিতে প্রদাহজনিত রোগ সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস ধরা পড়ে। চিকিৎসার একপর্যায়ে তাঁকে আইসিইউতে রাখা হয়। পরে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরে আবারও অসুস্থ হলে তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ৩০ নভেম্বর রাত ১০টা ২৩ মিনিটে সবাইকে কাঁদিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নেন আনিসুল হক। দায়িত্ব গ্রহণের সোয়া দুই বছরের মাথায় এভাবে তাঁর চলে যাওয়া নগরবাসীর জন্য এক বিরাট ক্ষতি।
তিনি শুধুই মেয়র ছিলেন না; ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন শিল্প-উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, সংগঠক ও নেতা। তাঁর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তিনি বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, সার্ক চেম্বার প্রভৃতি সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন; ছিলেন শিল্পানুরাগী টিভি ব্যক্তিত্ব। সদালাপী, বন্ধুবৎসল, প্রীতিকর ব্যক্তিত্বের অধিকারী আনিসুল হকের অভাব অনেক দিন ধরে অনুভূত হবে। মেয়র হিসেবে যিনি তাঁর শূন্যতা পূরণ করবেন, তাঁর মধ্যেও আনিসুল হকের মতো স্বপ্নদৃষ্টি ও আন্তরিক দায়িত্ববোধের তাড়না প্রত্যাশা করেন নগরবাসী।

আরো খবর

Disconnect