ফনেটিক ইউনিজয়
অরক্ষিত রোহিঙ্গা বস্তি : জঙ্গিঝুঁকিতে কক্সবাজার
সুজাউদ্দিন রুবেল

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৪ হাজার একরেরও বেশি পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছে নতুন ও পুরোনো প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। তবে এই বিশাল রোহিঙ্গা এলাকাজুড়ে নেই কোনো সীমানাপ্রাচীর অথবা কাঁটাতারের বেড়া। সেখানে প্রবেশাধিকারও সংরক্ষিত নয়। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সেখানে ঢুকতে পারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অপশক্তি গোষ্ঠীর লোকজনও। রোহিঙ্গা বস্তিতে নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি। তাই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে অভয়ারণ্য। প্রায় প্রতিদিনই ঢুকছে নতুন নতুন রোহিঙ্গা। আর বানের জলের মতো ভেসে আসা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে মিশে রোহিঙ্গা বস্তিতে অস্ত্রসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের লোকজন যে বিচরণ করছে না, এমন নিশ্চয়তা কে দেবে?
এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সেখানে কাজ করছে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এনজিও। আর এই এনজিওর আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত লোকজন। তাই সবকিছু বিবেচনা করে এ কথা বলা যেতেই পারে যে রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার জঙ্গিঝুঁকিতে রয়েছে। অরক্ষিত রোহিঙ্গা বস্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এসব কথা বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহামুদুল হক চৌধুরী। এর আগে রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশে জঙ্গিঝুঁকির আশঙ্কা জানিয়ে গত ১ নভেম্বর ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরাজুল হক টুটুল বলেন, মানবিক কারণে এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে এ দেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। মাত্র দুই মাসে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে। এদের সঙ্গে মিশে দু-একজন খারাপ লোক আসতেই পারে। তবে উখিয়া-টেকনাফে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সেখানে কাজ করছে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। তাই ভয়ের কিছু নেই।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) দেওয়া তথ্যমতে, কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার ২০টি ক্যাম্পে নতুন আসা ৬ লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গা        পৃষ্ঠা ১১ ক. ১
বসবাস করছে। এর মধ্যে উখিয়া-বালুখালী অস্থায়ী ক্যাম্প-১ এ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৬২৩ জন, কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পে ২৫ হাজার ৭৭৪ জন, টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে ২৪ হাজার ২৬ জন, টেকনাফ নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পে ৩৪ হাজার ৫৫৭ জন, টেকনাফ শামলাপুরে ২৬ হাজার ৩২৬ জন, উখিয়ার হাকিমপাড়া ক্যাম্পে ৫৫ হাজার ১৮১ জন, থাইংখালী ক্যাম্পে ২৯ হাজার ৭০৪ জন, উংচিংপ্রাং ক্যাম্পে ৩০ হাজার ৩৮৪ জন, জামতলী ক্যাম্পে ৩৩ হাজার ২৯৮ জন, ময়নারঘোনা ক্যাম্পে ২১ হাজার ৪৬৪ জন, চাকমারকুল ক্যাম্পে ১০ হাজার ৫০০ জন, কক্সবাজার সদরে ১৪ হাজার ১৬৮ জন, রামু উপজেলায় ২ হাজার ৪৩০ জন, টেকনাফে ৬৮ হাজার ৫১২ জন ও উখিয়ায় ১৭ হাজার ৬৬৮ জন রোহিঙ্গা রয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা ছাড়াও বান্দরবানের দুটি স্থানে ২০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির কোনারপাড়ায় (ঘুমধুম) ১০ হাজার ও চাকঢালায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এত বিশাল জনগোষ্ঠীর সহায়তার জন্য দেশের লোকজন তো বটেই, বিদেশ থেকেও আসছে অগণিত লোকজন। প্রায় প্রতিদিনই কমপক্ষে ৫ হাজার লোক সহায়তা দিতে কিংবা রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার বর্ণনা শুনতে আসছে। এ ছাড়া সেখানে নিয়মিত কাজ করছে ১০০টির মতো দেশি-বিদেশি এনজিও সংস্থা।
এ বিষয়ে জামতলী রোহিঙ্গা বস্তির মাঝি শফি বলেন, ‘আসলে এ দেশ রোহিঙ্গাদের জন্য যা করেছে কিংবা এখনো করছে, তা কল্পনাতীত। তাই এ দেশের হেফাজত করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক সমাজেই কিছু মন্দ লোক থাকে। আমাদেরও রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তাদের চিহ্নিত করতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই আমরা সাথে সাথে প্রশাসনকে অবহিত করি।’
কক্সবাজারস্থ র‌্যাব-৭-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর রুহুল আমিন বলেন, নতুন করে মিয়ানমার থেকে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। আসলে যেকোনো একটি জনগোষ্ঠী যখন বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নেবে, স্বাভাবিকভাবে সেই এলাকায় এর নৈতিক প্রভাব পড়বে। তারপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় ছোটখাটো কিছু অঘটন ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত তারা ৭ জন নতুন রোহিঙ্গাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কক্সবাজারস্থ বিজিবির ৩৪ ব্যাটালিয়নের উপপরিচালক মেজর ইকবাল আহমেদ বলেন, প্রথমদিকে যখন সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা ঢল নামে। সে সময় তল্লাশি করে এ দেশে প্রবেশ করানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না। উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, বিভিন্ন খারাপ কাজের সাথে জড়িত থাকায় কমপক্ষে ১০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরাজুল হক টুটুল বলেন, রোহিঙ্গাদের কারও সঙ্গে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, এমন সন্দেহ থেকে সেখানে পুলিশ, সাদাপোশাকে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতা চলছে। এ ছাড়া সেখানে ৫ জন ওসির অধীনে ৫০০ পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, মানবিকতা বিবেচনা করে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আনা হচ্ছে। এরপর সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থার লোকজন রোহিঙ্গাসহ সেখানে আসা সবার প্রতি বিশেষ নজর রাখছে।

Disconnect