ফনেটিক ইউনিজয়
গাছ পরিচিতি
দইগোটার রং রূপ
মোকারম হোসেন

ঢাকার কোনো পার্কে বেড়াতে গেলে গাছটি আমার মতো আপনারও দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে। কারণ চোখে পড়ার মতো তেমন আকর্ষণীয় কিছুই থাকে না প্রায় সারা বছর। শুধু চিরুনির ফলার মতো লালচে রঙের খোলসঅলা কতগুলো ফল চোখে পড়ে গাছে। তাও আবার উপাদেয় কোনো ফল নয় বলে মানুষের উৎসাহ খানিকটা কম। সবকিছু মিলিয়ে কিছুটা অবহেলিতই বলা যায়। তবে বর্ষার শেষভাগ থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ঈষৎ গোলাপি রঙের ফুলগুলো ফুটতে থাকে। শরৎ কিংবা হেমন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে আলো-ঝলমল নীলাকাশের পটভূমিতে এ ফুল আপনার মন কাড়বে নিশ্চয়। তখন গাছে দু-এক থোকা ফলও থাকে।
গাছটির সঠিক পরিচয় অনেকেরই অজানা। কেউ কেউ জাফরান বলেও ভুল করেন। আদতে জাফরান বেশ দু®প্রাপ্য ও নামিদামি সুগন্ধি। গাছ বর্ষজীবী ও পিঁয়াজকন্দীয়। জন্মে শীতের দেশে। জানামতে আমাদের দেশে জাফরান চাষ হয় না। তা ছাড়া আকার-আকৃতিতেও গাছ দুটি একেবারেই আলাদা। আলোচ্য গাছটি মূলত লটকন বা দইগোটা (Bixa orellana) নামেই বেশি পরিচিত। তবে দেশি ফল লটকা বা লটকনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের দেশে এ গাছের আরেকটি পরিচয় হচ্ছে এরা রঞ্জক উদ্ভিদ। ধারণা করা হয় বীজের রং দই রাঙানোর কাজে বেশি ব্যবহৃত হতো বলেই এমন নামকরণ। প্রাচীনকালে মানুষ যে কয়েকটি গাছ থেকে প্রাকৃতিক রং সংগ্রহ করত, দইগোটা তার মধ্যে অন্যতম। রঞ্জক উদ্ভিদ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়েই প্রথম এ গাছ সম্পর্কে জানতে পারি। বর্তমানে সীমিত পরিসরে প্রাকৃতিক এই রং ব্যক্তি উদ্যোগে বাজারজাত করা হচ্ছে। আরও ব্যাপকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হলে কৃত্রিম রং ব্যবহারের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে। ঢাকায় রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ কারও কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহেও দেখা যায়।
এরা ক্রান্তীয় আমেরিকার প্রজাতি। সতেরো শ শতাব্দীর দিকে স্প্যানিশদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। গাছ ছোট, ঝোপাল, ৪ থেকে ৫ মিটার উঁচু ও চিরসবুজ। পাতা বড়, ১০ থেকে ১৮ সেমি লম্বা, গোড়া তাম্বুলাকার, বোঁটা ৫ থেকে ৭ সেমি লম্বা। প্রস্ফুটনকাল শরৎ থেকে শীতের প্রথমভাগ অবধি। ফুল প্রায় ১০ সেমি দীর্ঘ মঞ্জরিতে গুচ্ছবদ্ধ থাকে, প্রতিটি ৫ সেমি চওড়া, একসঙ্গে অল্প কয়েকটি ফোটে। দেখতে গোলাপি, ঈষৎ বেগুনি বা সাদাটে। পাপড়ির মাঝখানে হলুদ-সোনালি রঙের একগুচ্ছ পুংকেশর থাকে। ফল ৩ থেকে ৫ সেমি চওড়া, লালচে বাদামি, নরম কাঁটায়ভরা। বীজ ৩ সেমি চওড়া, লাল শাঁসে জড়ান। এ বীজ থেকেই পাওয়া যায় প্রাকৃতিক রং। কৃত্রিম রঙের পরিবর্তে প্রাকৃতিক রংটাই আবার ফিরে আসুক। অন্তত খাদ্যসামগ্রীতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে। প্রকৃতিই আমাদের মনের ভাষা বোঝে এবং প্রকৃতিই আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু।

Disconnect