ফনেটিক ইউনিজয়
খুলনা শিল্পাঞ্চলে অচলাবস্থা
‘খাবারই জোটে না, কাজে গতি পাব কীভাবে’
জিয়াউস সাদাত

গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে খুলনার শিল্পাঞ্চলে। বকেয়া মজুরির দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৮ পাটকলের শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে বন্ধ হয়ে গেছে মিলগুলোর উৎপাদন। এর ফলে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে প্রায় ২ কোটি টাকা।
বকেয়া মজুরি বেতন পরিশোধসহ ১১ দফা দাবিতে পাটকলের শ্রমিকেরা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছেন। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে শিল্পাঞ্চল ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। আন্দোলন চলাকালেই ১ জানুয়ারি প্লাটিনাম জুট মিলের সুতা বিভাগের সরদার আবুল খায়ের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এ কারণে শ্রমিকেরা ৩ জানুয়ারি শোক পালন করেন। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্রথম কয়েক দিন মিছিল, সভা-সমাবেশ করেনি শ্রমিকেরা। মজুরি না পেয়ে অর্ধাহারী ক্ষুব্ধ ৫০ হাজার শ্রমিক আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের আহ্বানে এ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
৪ জানুয়ারি খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে সড়ক অবরোধ, টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। ওই দিন ক্রিসেন্ট, স্টার, ইস্টার্ন, খালিশপুর ও দৌলতপুর জুট মিলে শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হলেও প্লাটিনাম, আলীম ও জেজে আই জুট মিলে কোনো অর্থ প্রদান করা হয়নি। জুট মিল শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। ওই দিন খোলা হয় লঙ্গরখানা।
শ্রমিকেরা জানান, মজুরি না পেয়ে অভুক্ত অবস্থায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। নিরুপায় হয়েই তাঁরা উৎপাদন বন্ধ করে আন্দোলনে নেমেছেন। সব বকেয়া মজুরি একসঙ্গে না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা কাজে ফিরে যাবেন না। ক্রিসেন্ট জুট মিলের স্পিনিং বিভাগের শ্রমিক আবু কালাম জানান, ‘৯ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। খাবারই জোটে না, কাজে গতি পাব কীভাবে। ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে ভর্তি করানো যাচ্ছে না।’ প্লাটিনাম জুট মিলের তাঁত বিভাগের শ্রমিক হাসান বলেন, ‘দোকানদার আর বাকিতে চাল-ডাল দিচ্ছেন না, না খেয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’
প্লাটিনাম জুট মিল সিবিএ-র সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, মজুরি না পেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটানো শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অথচ মিল কর্তৃপক্ষ বকেয়া টাকা প্রদানের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের কার্যকরী আহ্বায়ক সোহরাব হোসেন বলেন, শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি একসঙ্গে পরিশোধ না করা পর্যন্ত কেউ কাজে ফিরে যাবেন না।
আলীম জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম লিটু বলেন, মিলের শ্রমিকেরা না খেয়ে রয়েছেন। তাঁদের পরিবারে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় শ্রমিকেরা বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নেমেছেন।
শ্রমিকদের দাবিগুলো
খালিশপুরের ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, দিঘলিয়ার স্টার, আটরা শিল্প এলাকার আলীম, ইস্টার্ন এবং নওয়াপাড়া শিল্প এলাকার জেজেআই পাটকলের শ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালন করছেন।
আন্দোলন শুরুর পর থেকে খালিশপুরে খুলনা-যশোর অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকলের নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করেন। বৈঠক হয় বিজেএমসির আঞ্চলিক কার্যালয়ে লিয়াজোঁ কর্মকর্তার সঙ্গেও। তিনি কর্মবিরতি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তবে শ্রমিকেরা মজুরি না পেয়ে কাজে যোগদান করবেন না বলে জানান।
৯ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদ পাটকলের শ্রমিকদের জন্য পে কমিশনের ন্যায়ে একই তারিখ থেকে মজুরি কমিশন ঘোষণা ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের আওতাধীন মিলগুলোয় কর্মরত প্রায় ৮৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এবং পাট ও পাটশিল্প পুনরায় গভীর সংকটে নিমজ্জিত। শ্রমিক কর্মচারীরা সময়মতো তাঁদের ন্যায্য পাওনা মজুরি-বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
পরিষদের নেতারা ১১ দফা দাবিও তুলে ধরেন দাবিপূরণ ও নতুন কর্মসূচি ঘোষণার লক্ষ্যে। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতার অপরিশোধিত বকেয়া এককালীন পরিশোধ, উৎপাদন বিভাগের শ্রমিকদের আগের মতো ৫০২ নম্বর সার্কুলার অনুযায়ী মজুরি প্রদান, নিজ নিজ পাটকলে সেটআপের অনুকূলে শূন্য পদের বিপরীতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বদলি শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণ, অবসর ও চাকরিচ্যুত শ্রমিক-কর্মচারীদের চূড়ান্ত পাওনা পিএফ ও গ্র্যাচ্যুইটি পরিশোধ ইত্যাদি।
শ্রমিকনেতারা জানান, ২০১৫ সাল থেকে পে কমিশন প্রদান করা হচ্ছে। অথচ শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি কমিশন গত আড়াই বছরে বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শ্রমিকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কর্তৃপক্ষ বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও মজুরি কমিশন গঠন করেনি। বরং তাঁদের সপ্তাহিক মজুরি দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে শ্রমিকেরা ফুঁসে উঠেছেন। মিলের কাজ বন্ধ রেখেছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ক্রিসেন্ট জুট মিলের প্রকল্পপ্রধান আবুল কালাম হাজারী জানান, মিলের হিসাবে কিছু টাকা এসেছে। যা দিয়ে একটা মজুরি ও কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের এক মাসের বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব। শ্রমিকেরা কাজে যোগদান করলে কর্মকর্তাদের বেতন না দিয়ে শ্রমিকদের দুটি মজুরি দেওয়া সম্ভব। এ প্রস্তাবে সিবিএ নেতারা রাজি হননি বলে জানান প্রকল্পপ্রধান। এ অবস্থায় একটি মজুরি ও কর্মচারী-কর্মকর্তাদের এক মাসের বেতন প্রদান করা হয়। প্লাটিনাম জুট মিলের প্রকল্পপ্রধান মো. শাহজাহান জানান,        
টাকা ব্যাংকে জমা না হলে মজুরি প্রদানের বিষয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না।
বিজেএমসি খুলনা অঞ্চলের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা গাজী শাহাদাত হোসেন বলেন, শ্রমিকেরা মিলের উৎপাদন বন্ধ করে অহেতুক পরিবেশ উত্তপ্ত করছেন। বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম ও যশোরের জেজেআই জুট মিল চালু থাকলে প্রতিদিন প্রায় ২২৫ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন হতো। সেই হিসাবে সপ্তাহে ১ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন বিঘ্নত হচ্ছে। যার মূল্য প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। সূত্রটি জানায়, ৮টি পাটকলের ২৬ হাজার ৭১৮ জন শ্রমিকের ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। সব মিলিয়ে শ্রমিকদের পাওনার পরিমাণ ৪০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। পাটকলগুলোয় বর্তমানে ২১ হাজার ৪৭৪ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে। যার মূল্য প্রায় ২১৫ কোটি টাকা।
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা গাজী শাহাদাত হোসেন বলেন, শ্রমিকদের পাওনার পরিমাণ ৪০ কোটি টাকা। উৎপাদিত কিছু পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ পাওয়া গেলে পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

Disconnect