ফনেটিক ইউনিজয়
নির্বাচন সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় রদবদল
এম ডি হোসাইন

নির্বাচনী বছরের শুরুতেই আচমকা পরিবর্তন এসেছে মন্ত্রিসভায়। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেই এই পরিবর্তন করা হলো। শিগগিরই আরেক দফা রদবদলের মাধ্যমে সমালোচনার মুখে থাকা আরও কয়েকজন মন্ত্রী বাদ পড়তে পারেন বলে সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হতেই পারে। তবে নির্বাচনের বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভায় শরিক দলগুলোকে বাদ দেবেন না। পরিবর্তন করলেও তাঁদের রাখবেন। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন সামনে রেখে শরিক দলগুলোর কদর অনেক বেড়ে যায়। তবে নিজ দলের সমালোচিত কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে নির্বাচনের আগে বাদ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি নিজের দল থেকে আরও নতুন মুখ যুক্ত করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব অঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব নেই, সেসব এলাকার নেতাদের মন্ত্রিপরিষদে আনা হতে পারে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেওয়া আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এ কে এম শাহজাহান কামাল লক্ষ্মীপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সাল থেকে তিনবার সরকার গঠন করা হয়। কিন্তু লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় কারও স্থান হয়নি। একইভাবে রাজবাড়ী থেকেও এর আগে কেউ শেখ হাসিনা সরকারের সময় মন্ত্রিসভায় ছিলেন না। এবারই প্রথম কাজী কেরামত আলীকে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা বলেন, ভোট সামনে রেখে এই দুই জেলার মানুষকে খুশি করার জন্য তাঁদের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে। ভোট আসন্ন বলেই রাজনীতিতে তাঁদের বিশেষ পরিচিতি না থাকলেও তাঁরা মন্ত্রী হয়েছেন। এভাবে আরও কয়েকটি জেলা থেকে নির্বাচনের আগে কেউ কেউ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে যে মন্ত্রীরা গত চার বছরে বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচিত হয়েছেন, তাঁদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।
আকস্মিক এই পরিবর্তন নিয়ে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সবারই জিজ্ঞাসা, হঠাৎ কেন এই পরিবর্তন? কেউ কেউ বলছেন, বিভিন্ন ঘটনায় সমালোচনার কারণেই মূলত এই পরিবর্তন করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী দেওয়ায় এমনও কথা বলা হচ্ছে যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের ক্ষমতা কমবে।
সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার মতে, তারানা হালিমকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা কার্যত কমেছে। এত দিন তিনি একটি বিভাগ একাই চালিয়েছেন। এখন একজন পূর্ণ মন্ত্রীর অধীনে কাজ করবেন। এতে তিনি ‘মনঃক্ষুণ্ন’ হয়েছেন বলেও শোনা যায়। মূলত যেসব মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী থাকেন, সেখানে প্রতিমন্ত্রীর বেশি কিছু করার থাকে না। তবে প্রতিমন্ত্রী থাকলে পূর্ণ মন্ত্রী কিছুটা চাপে থাকেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, নির্বাচনের বছর খানেক আগে মন্ত্রিসভায় যে রদবদল হয়েছে, তা আপাতত খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্বাচন সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসতেই পারে। বরং সামনে আরও সম্প্রসারিত হতেই পারে। এটি তেমন কোনো আলোচনার বিষয় নয়। সব সরকারই চায় শেষ মুহূর্তে কিছু ভালো কাজ করতে। এ জন্য সমালোচিতদের বাদ দিয়ে ভালোদের যুক্ত করা হয়। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভায় শরিক দলগুলোকে বাদ দেবেন না। এ ছাড়া যেসব অঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব নেই, সেসব এলাকার নেতাদের আনা হতে পারে।
টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, এক বছর অনেক সময়। এ সময়ের মধ্যে অনেক কিছু করা সম্ভব। মোবাইল ফোন অপারেটর, ইন্টারনেট সেবাদাতাসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেসব সমস্যা আছে, তা সমাধান করা গেলে ইন্টারনেটে এ অবস্থা থাকবে না। এই পরিবর্তন সম্ভব।
বিমান মন্ত্রণালয় থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়াকে ‘আকাশ থেকে মাটিতে আসা’র সঙ্গে তুলনা করে নতুন সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে ভারতেও এই ধরনের পরিবর্তন হয়। আমি এটাকে অস্বাভাবিক মনে করি না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আসায় সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করতে পারব। এত দিন আকাশে উড়ন্ত ছিলাম, এখন মাটিতে মানুষের কাছাকাছি এসেছি।’
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীসহ এখন মন্ত্রিসভার সদস্য দাঁড়িয়েছে ৫৩। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী ৩৩ জন, প্রতিমন্ত্রী ১৭ জন ও উপমন্ত্রী ২ জন। মন্ত্রী পদমর্যাদায় আছেন ৬ উপদেষ্টা। এর বাইরে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত আছেন এইচ এম এরশাদ। বর্তমান মন্ত্রিসভায় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির তিনজন, মহাজোট শরিকদের মধ্যে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন করে তিনজন সদস্য রয়েছেন।

Disconnect