ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৩
পাটের বাণিজ্য ও বিশ্বযুদ্ধ
জাকারিয়া পলাশ

একসময় বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। এখনো বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং উপকরণ হিসেবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের পাট। পাটশিল্পের ঐতিহ্য আর বর্তমান সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ তৃতীয় পর্ব

পাটশিল্পের বিশ্বায়নের ধারাবাহিকতায় বড় অবদান রেখেছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধও। বিশ্বযুদ্ধের কারণে একদিকে যেমন সাময়িকভাবে পাটের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বযুদ্ধ এই শিল্পের অবস্থান পশ্চিম গোলার্ধ থেকে সরিয়ে পূর্বদিকে নিয়ে এসেছে। আগেই বলা হয়েছে, শিল্প হিসেবে পাটের বাণিজ্য গতি পায় ১৯ শতকে। বিশ শতকের শুরুর দিকে তাতে নতুন ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধ।
বিষয়টি অনেকেরই অজানা নয় যে, প্রথম (১৯১৪-১৯) ও দ্বিতীয় (১৯৩৯-৪৫) বিশ্বযুদ্ধের মূল ক্ষেত্র ছিল ইউরোপ। প্রধানত ইউরোপীয় শক্তিগুলোই ছিল বিশ্বযুদ্ধের অক্ষ ও মিত্র শক্তি। আর এর ফলে ইউরোপের স্টিল, কয়লা, জাহাজ নির্মাণশিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন ও প্রভাব সৃষ্টি হয়। বাদ যায়নি স্কটল্যান্ডের পাটকলগুলোও।
পাটের বাণিজ্যে বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব আলোচনার আগে সার্বিকভাবে অর্থনীতির ওপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কী প্রভাব ছিল, তা খানিকটা আলোকপাত করা জরুরি। গবেষণার তথ্য বলছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই স্কটল্যান্ডের বেকারত্ব ভীষণ বেড়ে গিয়েছিল। স্টিল, শিপিং ও পাটকলের মতো ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পে ধস নেমেছিল। এই অর্থনৈতিক ধসের কারণেই বিপুল পরিমাণ স্কটিশ জনগণ দেশ ছাড়তে শুরু করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯২১-৩১ সাল নাগাদ স্কটল্যান্ডের জনসংখ্যা ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল, অর্থাৎ এসব লোক অন্য দেশে চাকরির সন্ধানে ছুটছিল। ১৯২২ সালে কর্মসংস্থানহীন লোকদের পুনর্বাসনের জন্য এম্পায়ার সেটেলমেন্ট অ্যাক্টের আওতায় চার লাখ লোককে ৬০ লাখ পাউন্ড অর্থ দেওয়া হয় ব্রিটিশ সরকারের তরফে। বিশ্বযুদ্ধ স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে ধস নামিয়েছিল।
আলাদাভাবে পাটকলের কথায় আসা যাক। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখত জাহাজ নির্মাণ, স্টিল মিলসহ ভারী শিল্পগুলো। কিন্তু সেখানকার পাটকলগুলো ছিল শ্রমঘন। ফলে কর্মসংস্থানের বড় অংশ হতো পাটকলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িককালে সেখানকার মোট শ্রমশক্তির ২৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৭ শতাংশ নারী পাটকলে কর্মরত ছিলেন।
তবে বিশ্বযুদ্ধের আগেই পাটকলের মালিকেরা কাঁচামাল ও শ্রমিকের প্রাপ্যতার কারণে কলকাতায় পাটকল স্থাপন শুরু করেন। কারণ, তখন ভারতীয় উপমহাদেশ এবং স্কটল্যান্ড, উভয়ই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ। এর মধ্যে যেকোনো এলাকায় শিল্প স্থাপনের সুযোগ ছিল উদ্যোক্তাদের। মজার ব্যাপার হলো, যখনই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো, তখনই সার্বিকভাবে পাটপণ্যের চাহিদা ও উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল। কারণ, সৈন্যদের          
রসদ সরবরাহের জন্য বস্তার প্রয়োজন বেড়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্যমতে, ১৯১৫ সালে ব্রিটেনের মোট খাদ্য চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন হতো। বাকি বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য আমদানি হতো আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ের জন্য বেড়েছিল পাটের বস্তার চাহিদাও। তা ছাড়া বালুর বস্তা দিয়ে বেড়া বা দেয়াল নির্মাণ করা হতো যুদ্ধক্ষেত্রে। সে সময়ের দাপ্তরিক হিসাব বলছে, এক মাসে ৬০ লাখ পাটের বস্তার চাহিদা সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পাটপণ্যের এই ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার জন্য এবং ডান্ডির শিল্পের বিকাশ রক্ষা করতে ব্রিটিশ সরকার একটি একপেশে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা কলকাতায় পাটকল চালানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে যুদ্ধকালে। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক যে বর্ধিত চাহিদা তার প্রায় পুরোটাই সরবরাহ হতো ডান্ডি থেকে। বাংলা থেকে শুধু কাঁচামাল রপ্তানি হতো। কিন্তু এই পুরো চাহিদা ও জোগানোর প্রবৃদ্ধিটি ছিল সাময়িক। যুদ্ধ থামার সঙ্গে সঙ্গে এই বিশাল বাজার নেমে এসেছিল শূন্যে। তখন অবশ্য, কলকাতায় পাটকলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়েছিল।
বিবিসির আর্কাইভস বলছে, স্কটল্যান্ডের ডান্ডিতে পাটকলগুলো ঝিমিয়ে পড়ার এটিই বড় কারণ। পরে অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি সময়ে পাটপণ্যের চাহিদা আবার বৃদ্ধি পায়। ধারণা করা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে পাটশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কৌশলী হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন পাটের চাহিদাটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রকেন্দ্রিক ছিল না। বস্তা আর চটের পাশাপাশি কার্পেট শিল্প তখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। তা ছাড়া তখন আরও নানামুখী বৈচিত্র্য আসে পাটের পণ্যে। অটোমোবাইল বা মোটরগাড়ির সিট কভার, বেডিং, কাগজ শিল্পে, ফার্নিচার পণ্যেও পাট ও সমধর্মী পণ্য ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৪১ সালে হেনরি ফোর্ড নামে একজন প্রকৌশলী পরীক্ষা করেন যে, গাড়ির ট্রাংকে সয়াবিন ও শণের সুতা ব্যবহার করে যথেষ্ট শক্তিশালী করা যায়। কিন্তু পরে গবেষণায় দেখা যায়, গাড়ির ভেতরের সজ্জার জন্য পাট আরও ভালো বিকল্প। কার্পেটের পেছনের কাপড় কার্পেট ব্যাকিং ক্লথ (সিবিসি), তৈলচিত্রের ক্যানভাস ইত্যাদিতেও পাটপণ্যের ব্যবহার শুরু হয়।
অবশ্য বিশ শতকের প্রথম দশকে ডান্ডির পাটশিল্পে যে ধস নেমেছিল, তা শুধু বাজারের ভাগ্যের ওপর নির্ভর করেই মোকাবিলা হয়নি। এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে জুট কন্ট্রোল অ্যাক্ট-১৯৩৯ ঘোষণা করা হয়েছিল, এ শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার জন্য। এই কৌশলের আওতায় যুদ্ধকালীন, যুদ্ধপূর্ব এবং যুদ্ধপরবর্তী পাটশিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কার্লো মরিলির ডিক্লাইন অফ জুট : ম্যানেজিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল চেঞ্জেস শীর্ষক গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘যুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত এ শিল্পের ধারাবাহিক অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল। ওই সময় নারী শ্রমিকনির্ভর শিল্প থেকে হেভি মেশিন ও পুঁজিসমৃদ্ধ (ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ) শিল্পে রূপ নেয় ডান্ডির পাটশিল্প। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পণ্যের অবস্থাও। অল্পদামের বস্তা বা চটের বদলে সেখানে মূল্যবান, শৌখিন ও বৈচিত্র্যময় পাটপণ্য উৎপাদন শুরু হয়।’
তবে ১৯৮০-৮১ সালে এসে ব্রিটিশ উৎপাদনমুখী শিল্পে বড় ধরনের মন্দা দেখা দেয়, যা ডান্ডির ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পকে দুর্বল করে দেয়। এভাবেই নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দুটি বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এবং এদের আগে-পরে পাটের ব্যাগ ‘বিশ্বপণ্যের বাহক বা ক্যারিয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ড প্রডাক্টস’ হিসেবে টিকে ছিল। কিন্তু শতকের শেষদিকে এসে সেই জৌলুশ ফিকে হয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। (চলবে)

Disconnect