ফনেটিক ইউনিজয়
কম তেলে বেশি দূরত্ব পার হবে গাড়ি
দূষণ কমাতে পেট্রোল অকটেনে বায়ো-ইথানল
নিজস্ব প্রতিবেদক

পেট্রোল ও অকটেনের সঙ্গে বায়ো-ইথানল মিশিয়ে যানবাহনে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য গাড়ির তেলে এই জৈব রাসায়নিক যৌগ ব্যবহার করা হবে। এ লক্ষ্যে বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপন এবং পরিচালনা-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী বছর গাড়ির জ্বালানি হিসেবে দেশে প্রথমবারের মতো এটি ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, পরিবেশদূষণ কমানোর জন্য গাড়িতে প্রচলিত জ্বালানি পেট্রোল ও অকটেন ব্যবহারের হার কমানোর চিন্তাভাবনা অনেক দিনের। এ লক্ষ্যে সিএনজি এবং অটোগ্যাসের প্রচলনও করা হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেট্রোল-অকেটেনের ব্যবহারও বাড়ছে। তেলে বায়ো-ইথানল মিশিয়ে ব্যবহার করা হলে গাড়ি অপেক্ষাকৃত কম অকটেন বা পেট্রোল পুড়িয়ে বেশি দূরত্ব পার হতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণ কমবে। ২০১৯ সালের মধ্যে গাড়ির তেলে বায়ো-ইথানল ব্যবহার শুরু করতে সরকার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করছে।
এ বিষয়ে গত ডিসেম্বরে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রচলিত জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে পেট্রোল ও অকটেনের সঙ্গে ৫ শতাংশ কিংবা সরকার নির্ধারিত হারে ৫ শতাংশের কমবেশি মাত্রার বায়ো-ইথানল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
বায়ো-ইথানল হলো জৈব কাঁচামাল ব্যবহার করে গাঁজন (ফারমেন্টেশন) প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন একধরনের রাসায়নিক দ্রব্য। নির্ধারিত মান রক্ষা করে তৈরি হওয়া বায়ো-ইথানল জ্বালানি ও জ্বালানি সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এটি উৎপাদন করার অনুমতি পেলেও তারা বিপণন করতে পারবে না। বিপিসির কাছে এটি বিক্রি বা সরবারহ করতে হবে। বিপিসি তা তেলে মিশিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, শিল্প খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জ্বালানি সহায়ক পণ্য হিসেবে বায়ো-ইথানল উৎপাদন ও প্ল্যান্ট স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ধরনের প্ল্যান্টের কাঁচামাল হিসেবে জীবাশ্ম (বায়োমাস) ব্যবহার করা হয়। গাঁজন পদ্ধতিতে উদ্ভূত বায়ো-ইথানল পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভুট্টার দানা, ঝোলাগুড়, পুরোনো সংবাদপত্র, পুরোনো নরম কাগজ, তুষ, ভুট্টাগাছ, আখের ছোবড়া, সুতা কারখানার বাতিল সুতা ও তুলা, ধানের খড়, গাছের বাকল থেকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় বায়ো-ইথানল তৈরি করা হয়। এ ছাড়া পৌর মিউনিসিপ্যাল বর্জ্য (বিভিন্ন সবজির পরিত্যক্ত অংশ), কচুরিপানা, বিট, জলজ ও বনজ নরম উদ্ভিদ, সুইস গ্রাসের মতো কাঁচামাল থেকেও এটি উৎপাদিত হবে।

বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রাথমিক অনুমোদনের শর্ত
বেসরকারিভাবে বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনে কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভুট্টার দানা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। দেশীয় ভুট্টা এ প্ল্যান্টে ব্যবহার করা যাবে না। এর বাইরের অন্যান্য কাঁচামাল বাংলাদেশ থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহে সমস্যা হলে তা বিদেশ থেকে বিধি মোতাবেক পদ্ধতিতে আমদানি করা যাবে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঁচামাল থেকে বায়ো-ইথানল উৎপাদন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মনোনীত প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে হবে। বিপিসি ওই বায়ো-ইথানল বা পণ্য গ্রহণ করতে না পারলে তা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় রপ্তানি করতে পারবে। পেট্রোল ও অকটেনের সঙ্গে ৫ শতাংশ বা সরকার নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য মাত্রার বায়ো-ইথানল মিশ্রণ করার জন্য বিপিসি বা এর মনোনীত প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি অথবা সরবরাহ করতে হবে।
বিপিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রাথমিক অনুমতিপত্র প্রাপ্তির ১৮ মাসের মধ্যে আবেদনকারী অথবা প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, ছাড়পত্র অথবা অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হবে। প্ল্যান্ট স্থাপনের পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে হবে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বায়ো-ইথানল বিপিসির নির্ধারিত স্থান বা ডিপোতে সরবরাহ করবে। বিপিসির মনোনীত প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হারে বায়ো-ইথানল পেট্রোল ও অকটেনের সঙ্গে মিশ্রণ করবে। বায়ো-ইথানল যাতে পানযোগ্য পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা না যায়, সে জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিনেচার্ড বা দুর্গন্ধযুক্ত দ্রব্যাদি মিশিয়ে পানের অযোগ্য করতে হবে। উৎপাদিত বায়ো-ইথানল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক মান নিয়ন্ত্রণ সনদ পেলেই তা বিপিসি গ্রহণ করবে।

Disconnect