ফনেটিক ইউনিজয়
সংরক্ষিত আসন কার জন্য সংরক্ষিত?
আমীন আল রশীদ

গত ২৯ জানুয়ারি, যেদিন মন্ত্রিসভায় আলোচিত-সমালোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়, ওই বৈঠকেই জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত (নারী) আসনের মেয়াদ ২৫ বছর বাড়িয়ে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর খসড়ায়ও অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। যদিও আলোচনার টেবিলে ইস্যু হিসেবে এটি জায়গা পায়নি।
সংবিধান অনুযাযী, সংসদে এখন ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। তাই আগামী নির্বাচনের আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের জানান, ৫০টি নারী আসন সংরক্ষণের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বাড়ানোর জন্যই এই সংশোধনী। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি অধিবেশনেই এই সংশোধনী অনুমোদনের জন্য সংসদে তোলা হতে পারে।
সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী, সরাসরি ৩০০ জন এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে বাকি ৫০টি সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যদিও এই সংরক্ষিত আসনের এমপিদের কাজ ও এখতিয়ার, প্রয়োজনীয়তা, নারী উন্নয়নে সংরক্ষিত আসনগুলো আসলেই কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়েই বিতর্ক হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। বিশেষ করে নবম সংসদে প্রধান দুটি দলের সংরক্ষিত আসনের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের আচরণ ও কথাবার্তায় এই পদটি যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে। অনেক সময় এমন কথাও উঠেছে যে, সংরক্ষিত আসনগুলো আসলে আলঙ্কারিক।
প্রশ্ন হলো, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন কেন থাকতে হবে? নারীরা সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ, তাই তাঁদের জন্য সংসদের সংরক্ষিত আসন থাকা উচিত, এর পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। যেমন সমাজ ও রাষ্ট্রের আরও যেসব পিছিয়ে পড়া অংশ যেমন আদিবাসী (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী), ধর্মীয় সংখ্যালঘু, শারীরিক প্রতিবন্ধী, দলিত- তাদের জন্য সংসদে আসন কেন সংরক্ষিত থাকবে না?
আমাদের দেশের নারীরা যে পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে নেই, তার বড় প্রমাণ রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়ই নারীরা সগর্বে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান সংসদের ২২ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত। যাঁদের মধ্যে গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত শেখ হাসিনা এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, রংপুর-৬ আসন থেকে নির্বাচিত ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জাতীয় সংসদের স্পিকার, ফরিদপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সংসদ উপনেতা, ময়মনসিংহ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত রওশন এরশাদ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, শেরপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত বেগম মতিয়া চৌধুরী কৃষিমন্ত্রী, যশোর-৬ আসন থেকে নির্বাচিত ইসমাত আরা সাদেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। নবম সংসদেও শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, সাজেদা চৌধুরী, রওশন এরশাদ, মতিয়া চৌধুরী, দীপু মনিসহ ১৮ জন নারী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। সুতরাং নারীদের জন্য আলাদা করে ৫০টি আসন কেন রাখতে হবে?
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যরা কোনো নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হন না। তারপরও তাঁদের সাংবিধানিক মর্যাদা সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের মতোই। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিতদের মতোই তাঁরা প্রিভিলেজ বা বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। বিল পাস ও সংসদের অন্যান্য প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। এমনকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও হতে পারেন। তাঁদের বেতন-ভাতা-সম্মানী এবং শুল্কমুক্ত গাড়ি আনার সুযোগও সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও সামাজিকভাবে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কারণ তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী এলাকা নেই। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেই এলাকায় যেহেতু সরাসরি নির্বাচিত এমপি রয়েছেন, ফলে ভোটার ও অন্যান্য মানুষের কাছে সংরক্ষিত আসনের এমপিরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। বড় কোনো সমস্যার সমাধান বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের বিবেচনা করা হয় না।
বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষকে অসংসদীয় ভাষায় আক্রমণে এই সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরাই এগিয়ে থাকেন। এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটা কী? রাজনৈতিকভাবে তাঁদের ক্ষমতা ও এখতিয়ার কম বলে সেটি সংসদে হইচইয়ের মাধ্যমে পুষিয়ে দেন? নবম সংসদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন সংরক্ষিত আসনের এমপি সংসদে তাঁদের ‘গলাবাজি’র কারণে মোটামুটি মার্কামারা হয়ে গিয়েছিলেন। যদিও গত কয়েক বছরে এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। কারণ সংসদে বিএনপি নেই। বিরোধী দল নামে জাতীয় পার্টি থাকলেও তারা যেহেতু সরকারেরও অংশ, ফলে তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে ‘সরকারি বিরোধী দল’ হিসেবে। এ কারণে কয়েক বছর ধরে সংসদে অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার একেবারেই কমে গেছে।
অপ্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত এই ৫০ জন নারী সাংবিধানিকভাবে আইনপ্রণেতা, কিন্তু তারপরও শাসনকাজে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য। একজন নারী সদস্যকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, গত ৫ বছরে আপনি কী কী করেছেন, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় কী ভূমিকা রেখেছেন, তাতে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো জবাব আসবে বলে মনে হয় না।
তাহলে সমাধান কী? সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান বাতিল? নিশ্চয়ই না। আমাদের এর বিকল্প বের করতে হবে। নারীরা পিছিয়ে আছেন, সুতরাং তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার পথের বাধাগুলো দূর করতে হবে। কিন্তু সেটি হতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়ে। তাঁরা কেন সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হবেন? তাঁরা কেন অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করে সংসদের আসন লাভ করবেন? তাঁরা যে পুরুষ প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দি¦তা করেই জয়ী হতে পারেন, তার ভূরি ভূরি উদাহরণ তো আমাদের সামনে রয়েছে। সুতরাং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও কেন নারীদের পরমুখাপেক্ষী করে রাখতে হবে?
সংরক্ষিত আসনব্যবস্থা বাতিল করে এর বিকল্প হিসেবে সংসদের মূল আসনসংখ্যা ৩০০-এর সঙ্গে সংরক্ষিত ৫০টিকে বিভিন্ন জেলায় ভাগ করে সব দল যদি কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দিতে বাধ্য হয়, তখন দেখা যাবে সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে এবং সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসার ফলে তাদের মর্যাদা ও গুরুত্বও বাড়বে। কোন কোন আসনগুলো নারীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে, সেটি দলের নীতিনির্ধারকেরা সিদ্ধান্ত নেবেন। কিছু আসনে হয়তো জটিলতার সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে যেখানে দলের পুরুষ প্রার্থী অনেক বেশি ক্ষমতাবান, সেখানে তুলনামূলক কম ক্ষমতাবান নারীকে প্রার্থী করলে দলীয় কোন্দল বেড়ে যাওয়া কিংবা ওই নারী প্রার্থীর হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। কিন্তু এটি নারীদের ব্যাপারে আমাদের সামগ্রিক রাজনীতির যে বিবেচনা ও দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিও পরিবর্তন করা দরকার। নারী মানেই তাঁর জন্য বিশেষ সুবিধা রাখতে হবে, এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসারও সময় হয়েছে। তা ছাড়া শিক্ষিত নারী কারও করুণা চায় বলেও মনে হয় না।
নারী জনপ্রতিনিধিদের স্রেফ অলঙ্কার বলে বিবেচনা করা হবে না। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, সাজেদা চৌধুরী কিংবা মতিয়া চৌধুরীর মতো নারীরা যেখানে সরাসরি ভোটে পুরুষকে হারিয়ে বিজয়ী হতে পারেন, সেখানে পরোক্ষ ভোটে ৫০ জন নারীকে নির্বাচিত করার বিধানটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক বলে মানা যায় না। সুতরাং নারী উন্নয়নই যদি হয় সংরক্ষিত নারী আসনের মূল দর্শন, তাহলে এই বিধান বাতিল করে তাঁদের কোনো একটি সংসদীয় এলাকা থেকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করে আনাই হতে পারে সেই দর্শন বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার।

Disconnect