ফনেটিক ইউনিজয়
বাংলাদেশে পাটশিল্প : পর্ব-৬
লোকসান কমাতে ফের বেসরকারীকরণ
জাকারিয়া পলাশ

একসময় বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। এখনো বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং উপকরণ হিসেবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের পাট। পাটশিল্পের ঐতিহ্য আর বর্তমান সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ ষষ্ঠ পর্ব

রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনতার পর পুনরায় বিকশিত হতে শুরু করে পাটশিল্প। কিন্তু সে ধারা খুব একটা স্থায়ী হয়নি। সোনালী আঁশখ্যাত এই পাট দ্রুতই চাকচিক্য হারায়। রাষ্ট্রীয়করণ, ভর্তুকিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের ওপর ভর করে ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো লাভজনক অবস্থা দেখা যায় পাটে। কিন্তু এরপর তা শ্বেতহস্তিতে পরিণত হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা হ্রাস এ সংকটের প্রথম কারণ। দ্বিতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবস্থাপনার অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা আর কর্মী ও শ্রমিকদের মধ্যে সীমাহীন দুর্নীতির বিস্তার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
মূলত ষাটের দশকেই পাটের বিকল্প হিসেবে সিনথেটিক উপাদান নাইলন ও পলিথিন ব্যবহার শুরু হয় বিভিন্ন দেশে। তবে সেটি চূড়ান্তভাবে পাটশিল্পের ওপর বড় ধাক্কা সৃষ্টি করে ১৯৮০-এর দশকে এসে। সে সময় সস্তা ও টেকসই বলেই সিনথেটিকের ব্যবহার বিশ্বে ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ফলে পাটের চাহিদা হ্রাস পায়। সে সময় কৃষকেরা প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়ায় তাঁদের পাটে আগুন দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। পাট খাতের অনেক উদ্যোক্তা তাঁদের ব্যবসা বদলে ফেলেছিলেন। অনেকে ব্যবসার আকার সীমিত করে ফেলতে বাধ্য হন।
এই অবস্থার শুরু হয় ১৯৮০ সালের পর থেকে। আর এ সময়টিই হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর পাটশিল্পের দ্বিতীয় ধাপ। ওই সময়ের পাটশিল্প সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯৯৫ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা এক নথিতে। তাতে লেখা হয়, ‘বিদেশি বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশে গড়ে ওঠা বিরাট পাটশিল্প সত্তরের দশক থেকে, বিশেষ করে আশির দশকে কৃত্রিম তন্তুর সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয় এবং বিশ্ববাজারে ক্রমাগত দর খোয়াতে থাকে। গত ২০ বছরে (১৯৭৫-৯৫) পাটের রপ্তানি প্রতিবছর গড়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারে সংকুচিত হতে থাকে। পাটের দর তীব্রভাবে হ্রাস পেতে থাকে।’
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বাংলাদেশের পাটশিল্প কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। পাটশিল্পের দক্ষতা বৃদ্ধি ও গত উৎপাদন খরচ হ্রাস করার কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একইভাবে পাটের বহুবিধ ব্যবহার উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা ও গবেষণা ছিল অত্যন্ত সীমিত ও নগণ্য। ফলে খাতটি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারায় এবং লাভজনক ধারা থেকে বিচ্যুত হয়। ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে এ খাত লোকসান দিতে থাকে।’
ওই দশকেই দেখা যায়, পাটকলগুলোতে টনপ্রতি পণ্যের উৎপাদন খরচ রপ্তানি আয়ের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এমন পরিস্থিতিতেই ১৯৮২ সালের জুলাইয়ে পুনরায় বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেয় সরকার। পাকিস্তান আমলের যেসব পাটকল ১৯৭২ সালে সরকার রাষ্ট্রীয়করণ করেছিল, তাদের মধ্যে বাংলাদেশি মালিকদের পাটকলগুলো ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয় পাটকল করপোরেশনকে (বিজেএমসি)। ওই বছরের ডিসেম্বর নাগাদ ১০টি পাটকল বাংলাদেশি মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ হস্তান্তরপ্রক্রিয়ার সময় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পাটকলগুলো তখন যে ঋণের বোঝা বহন করছিল, নতুন মালিকেরা ওই ঋণের বোঝা গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। অনেকে পাটকল নিয়েছেন পূর্বজদের প্রতিষ্ঠিত বলে, কিন্তু পরে তা চালাতে না পেরে বন্ধ করে দিয়েছেন।
তবে সরকার বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছিল। লোকসানি মিলগুলোকে ধরে ধরে বেসরকারি মালিকানায় দিয়ে দেওয়ার কাজ চলেছে। এই উদ্যোগের ফলে দেশে সরকারি মালিকানায় বিজেএমসির অধীনে একগুচ্ছ পাটকলের পাশাপাশি বেসরকারি মালিকানায় আরেক গুচ্ছ পাটকল খোদ বিজেএমসির প্রতিযোগী হয়ে ওঠে। বেসরকারি পাটকল-মালিকেরা ওই সময় বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) নামে একটি সংগঠন গঠন করে তাদের স্বার্থ ও দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে তদবির শুরু করে।  
এদিকে পাট খাতের এই বিরাট লোকসান প্রধানত সরকার নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পুষিয়ে নিতে হয়েছিল। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে অনাদায়ী ঋণ থাকা সত্ত্বেও পাটকলগুলোকে ঋণ দিতে থাকে। ফলে ১৯৯২ সালের জুন মাসে সরকারি ও বেসরকারি পাটকলগুলোর এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের সম্মিলিত অনাদায়ী ব্যাংক দেনার পরিমাণ ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে বেসরকারি পাটকলের ঋণ ছিল ৯০০ কোটি টাকা। বাকিটা সবই ছিল সরকারি পাটকলগুলোর ঋণ।
বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির কারণে সরকারের পক্ষে এসব পাটকল একযোগে বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে লোকসান আর ঋণ নিয়েই বিশালদেহী পাট খাত চলছিল। ১৯৮৭ সালে অনাদায়ী ব্যাংক ঋণকে আলাদা করে একটি নিষ্ক্রিয় হিসাবে রাখা হয়। ওই ঋণের ওপর তিন বছরের সুদ ব্যাংককে পরিশোধ করা হয়। তা ছাড়া পাটপণ্য রপ্তানির ওপর ১৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এত উদ্যোগের পরও এ খাত লাভে ফিরে ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে পাট খাতের সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে মঞ্চে হাজির হয় বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা। (চলবে)

Disconnect