ফনেটিক ইউনিজয়
অবিশ্বাস অনাস্থায় ঢিমেতালে বীমা খাত
ইমদাদ হক

সঞ্চয়ের দ্বিগুণ লাভ বীমা পলিসিতে। বিপদে যেমন ভরসা, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও নিরাপদ মূলধন- এমন আশ্বাস থেকেই বীমা পলিসি খোলেন নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার পাঁচ শতাধিক গ্রাহক। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির উপজেলা ব্রাঞ্চ সমন্বয়ক আবদুল আজিজের কাছে পলিসির মাসিক প্রিমিয়াম জমা দেন। ২০১২ সালের পর থেকে বীমাগ্রাহকরা মাসিক ৫০০, ১ হাজার বা দেড় হাজার টাকার প্রিমিয়াম জমা দেন। গ্রাহকদের দেয়া হয় জমার ভুয়া রসিদ। এরপর একদিন পালিয়ে যান আজিজ। পাঁচ বছরের জমানো সঞ্চয় হারিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন গ্রাহকরা। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ফল মেলেনি খুব একটা। তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা তুলে ধরেন। প্রক্রিয়াগত সমস্যায় টাকা ফেরত না পাওয়ার শঙ্কা এসব গ্রাহকের। যদিও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়ার ব্যাপারে তারা কাজ শুরু করেছেন।
সারা দেশের কোথাও না কোথাও প্রতি মাসে বীমা বিষয়ে অর্থ আত্মসাৎ, চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা বা পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অর্থ না দেয়ার ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনেও (এনবিআর) জমা হচ্ছে প্রতারণার অভিযোগ। বিপরীতে ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা দেখা যায়নি খুব একটা। এসব কারণে এখনও দেশের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি বীমা খাত। পায়নি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও।
দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্যমতে, ১৭ জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের ১ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি এখনও। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অফিস ব্যবস্থাপনা খরচ দেখিয়ে এ টাকা আত্মসাৎ করা হতো। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করেছে। বাকিগুলো এখনো দেয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাজ চলছে। শিগগিরই বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে, অভিযোগ প্রমাণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে সংস্থাটি। আবার কয়েকটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে কয়েকশ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে এনবিআরে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে অনেক কোম্পানি থাকলেও এখানে র বাজারটি খুব একটা উন্মুক্ত হয়নি। কোনো গাড়ি র আওতায় আনা হলেও যথাযথ লাইফ কাভারেজের বাইরে থাকছে এর যাত্রী বা চালক। করপোরেট সুশাসন, মানবসম্পদের মান, প্রদেয় প্রডাক্ট ও সম্পদ-দায়ের ব্যবস্থাপনা এখানকার  খাতে খুবই দুর্বল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মানিক চন্দ্র দে বলেন, ‘আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, একটি আইনের খসড়া করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সেগুলো আইডিআরএতে পাঠানোর পর স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে অনেক সময় নষ্ট হয়। এতে সঠিক সময়ে সঠিক আইন করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।  খাতে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তার সুফল পেতে হলে গতানুগতিক পণ্যের বাইরে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জীবন ও সাধারণ  মিলিয়ে এখনো বাংলাদেশের  বাজারের পরিসর তেমন বড় নয়, সাকল্যে যার প্রিমিয়াম ৯৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের  শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম। বৈশ্বিক  শিল্পের তুলনায় যা দশমিক ২ শতাংশ মাত্র। আর মাথাপিছু  ব্যয় কেবল ২ দশমিক ৬ মার্কিন ডলার। জিডিপি অনুপাতে প্রিমিয়াম মাত্র দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে দশমিক ৭ শতাংশ জীবন ও বাকি দশমিক ২ শতাংশ সাধারণ বীমা। গত কয়েক বছরে সাধারণে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ শতাংশের কাছাকাছি। আর জীবনে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২৬ শতাংশ।
মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্সগুলোকে দেখার কেউ নেই। কোম্পানিতে নিয়মিত অডিট হচ্ছে না। আইডিআরএকে অন্তত দুই বছর পরপর অডিট করতে হবে। পাশাপাশি  কোম্পানির এমডিকে গ্রাহকদের টাকা সঠিকভাবে দেখভালের জন্য আইডিআরএকে তদারক করতে হবে।’
গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক  বাজারে মন্দাবস্থা দেখা দিলেও বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এর দৃশ্যমান প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। শিল্পায়িত দেশে জীবনে ২ দশমিক ৮ ও সাধারণে দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। ব্যক্তি খাতের জীবনে প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধি ও নবায়ন সম্ভব হয়েছে দেশে সুজন, গৃহ সঞ্চয়, গণ, গ্রামীণ, লোক, জন, পল্লী, ইসলামী, ক্ষুদ্র, গ্রুপ ও ওয়েজ আর্নারস গ্রুপের মতো ক্ষুদ্র  প্রবর্তন করে জীবন ব্যবসা বৃদ্ধির মাধ্যমে। যদিও গত কয়েক বছরে কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে। তবে অধিকাংশ কোম্পানিই এখনও টিকে থাকার লড়াই করছে। কিছু জীবন কোম্পানি মফস্বল এলাকায় নিজেদের অনেক শাখা বন্ধ করে দিয়েছে এবং নতুন চালু হওয়া বেশির ভাগ শাখা এখন প্রায় নিভু নিভু।
শিল্পে জনশক্তির মান খুবই দুর্বল। আর তা উন্নয়নে তেমন বিনিয়োগ কিংবা সংশ্লিষ্ট মহলের নজর দৃশ্যমান নয়। এমনকি কিছু কোম্পানির কর্মকর্তারা তাদের ইচ্ছানুযায়ী কাজ না করায় রাজনৈতিক মহলের যোগসাজশে নিয়ন্ত্রকদের হয়রানি বা বিব্রত করার চেষ্টা করছে। রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রবাসী শ্রমিক থেকে কৃষিজীবীসহ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনো এর আওতার বাইরে রয়ে গেছে। সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান রুবিনা হামিদ বলেন, ‘জীবন  কোম্পানির উন্নয়নে এজেন্ট দিয়ে  পলিসি বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনে পলিসি বিক্রি করতে হবে।’
প্রিমিয়াম সংগ্রহ, পুনঃবীমা, দাবি নিষ্পত্তিসহ কিছু বিষয়ে বড় দুর্নীতির অভিযোগ আছে। অনেক মালিকই মিথ্যা দাবি সাজিয়ে পূর্বতন তারিখে কাভার নোট ইস্যু এবং অন্য অন্যায্য প্রভাবের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করছে। এ প্রসঙ্গে আইডিআরএ চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘গ্রাহকদের অনাস্থা ও কমিশন বাণিজ্য খাতকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে ইমেজ সংকট। এগুলো দূর করার উদ্যোগ নিয়েছি। অনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে হবে। গ্রাহক প্রতারণা বন্ধে জোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’

Disconnect