ফনেটিক ইউনিজয়
পাটের হালচাল : পর্ব-১০
প্রচারেই সীমাবদ্ধ অগ্রগতি
জাকারিয়া পলাশ

একসময় বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। এখনও বাংলাদেশের রফতানি আয়ে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং উপকরণ হিসেবে এখনও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের পাট। পাটশিল্পের ঐতিহ্য আর বর্তমান সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দশম পর্ব

বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পাটশিল্প এখনো টিকে আছে। বাংলাদেশের শিল্প, উন্নয়ন আর পাট খাতের ইতিহাস যেন অঙ্গাঙ্গিভাবেই এগিয়ে চলেছে ছন্দ-দ্বন্দ্বের দোলাচলের মধ্যেই। আগের নয়টি পর্বের ধারাবাহিক আলোচনায় ঐতিহাসিক নানা ঘটনাবলির সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পের অনুসঙ্গ বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচিত হয়েছে নিকট অতীতের নানা সংস্কার কর্মসূচি ও বর্তমান হালহকিকতও। সুদীর্ঘ এ ধারাবাহিক আলোচনার চলতি পর্ব যখন পাঠকের হাতে যাচ্ছে, তখন দেশে পাটকে স্মরণ করা হচ্ছে নতুন আড়ম্বরতায়। গত বছর থেকে বাংলাদেশ সরকার পাটশিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে নতুন একটি উপলক্ষ সৃষ্টি করেছে। ৬ মার্চকে ঘোষণা করেছে জাতীয় পাট দিবস হিসেবে। সে হিসেবে চলতি মাসের ৬ মার্চও পাট দিবসের আয়োজন হয়েছে। পাট দিবসকে কেন্দ্র করে রাজধানীকে সাজানো হয়েছে পাটের রঙে। ‘সোনালী আঁশের সোনার দেশ, পাটপণ্যের বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দ্বিতীয়বারের মতো ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবস পালিত হয়ে গেল।
এ দিবস পালনের উদ্দেশ্যে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নেয়া হয়। আয়োজন উপলক্ষে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম জানান, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দিবসের মূল অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে পাট নিয়ে স্কুল পর্যায়ে রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ছয়জনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১১ ক্যাটাগরিতে ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দেয়া হয়। এছাড়া পাটজাত পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রির জন্য ৬ থেকে ৮ মার্চ পাটপণ্য মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এছাড়া পাট দিবসের বিকালে রাজধানীর হাতিরঝিলে আয়োজন করা হয় নৌ-শোভাযাত্রা। জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত হয় রোড শো। সব মিলিয়ে পাট দিবসে পাটশিল্প ও পাটপণ্যের ব্যাপক প্রচারণার আয়োজন করা হয়েছে।
আড়ম্বর এসব আয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতেই আলোচনায় থাকা দরকার, বর্তমানে বাংলাদেশের পাটশিল্পের সামগ্রিক অবস্থা কোথায়?      
অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের গবেষণায় তোষা পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করার পর নতুন করে সাড়া জাগায় পাটশিল্প। হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে পাটশিল্প, এমন আশাবাদ সৃষ্টি হয়। তার পর থেকেই সরকারি পর্যায়ে পাটের সম্ভাবনা আর সাফল্য নিয়ে প্রচারণা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি আলোচনায় আসে পাটের বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধির প্রসঙ্গ। সরকার ১৭টি পণ্যের প্যাকেজিংয়ের জন্য পাটব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে একটি আইন পাস করে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা হয়। বিজেএমসির পক্ষ থেকে পাটপাতা ব্যবহার করে চায়ের বিকল্প এক ধরনের পানীয় উদ্ভাবন করে বাজারজাত করা হয় চলতি বছরে। পলিথিনের মতো স্বচ্ছ এক ধরনের ব্যগ তৈরি করা হয় পাটের উপাদান ব্যবহার করে। সেটিও এরই মধ্যে প্রচারণায় এসেছে। এগুলো সবই পাট খাতের নতুনত্ব আর আশার সঞ্চার করে।
তবে এসব সম্ভাবনার মধ্যেই হিসাব করা দরকার, সার্বিকভাবে পাটশিল্পের বাজারে কতটা পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। বাস্তবতা হলো, এখনও নতুন এসব পণ্য পাট খাতের মোট আয়ে অংশীদার হতে পারেনি। রফতানিসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশে যেসব পাটপণ্য রফতানি হয়, তার প্রায় ৭০ শতাংশই পাটের সুতা। এছাড়া চট, বস্তাও বিক্রি হয়। ১০ শতাংশের মতো বিক্রি হয় কাঁচা পাট। সে হিসেবে পাটের তৈরি উন্নত ও মূল্যবান (হাইভ্যালু) পণ্যের অংশ এ খাতের মোট রফতানিতে ১০ শতাংশও নয়। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতিশীল এসব খাতে এখনও সুফল আসেনি। এদিকে দেশের বাজারে খাদ্যপণ্য প্যাকেজিংয়ে পাটব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার আইন থাকলেও তার বাস্তবায়নের শিথিলতা রয়েছে। সিনথেটিক পণ্যের সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে পাটপণ্যের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম।
এদিকে সরকারি তরফে পাট খাতের এত প্রচারণা হলেও সরকারি মালিকানাধীন পাটকলগুলোর লোকসানি চরিত্রের কোনো পরিবর্তন নেই। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, পাট ও পাটপণ্য রফতানি করে অর্জিত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার ৯১ শতাংশই আসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। পক্ষান্তরে বিজেএমসির আয়-ব্যয় বিবরণীতে দেখা গেছে, গত বছর এর অধীন ২৫টি পাটকলের রফতানি আয় ৭৬ কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে বিজেএমসির বিক্রি কমেছে ১৬০ কোটি টাকার। আর প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান আগের বছরের চেয়ে ১৭৫ কোটি টাকা কমলেও এখনও এদের নিট লোকসান রয়েছে ৪৮১ কোটি টাকা। এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিজেএমসির পাটকলগুলোয় উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি। এছাড়া বেসরকারি পাটকলগুলোর চেয়ে এখানে শ্রমিকদের মজুরিও বেশি দিতে হয়। ফলে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়লেও সার্বিকভাবে লোকসান এড়ানো যাচ্ছে না। তবে গত অর্থবছরে বিজেএমসির নিট লোকসান ১৭৫ কোটি টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে।’ এছাড়া মজুরি বাবদ বিপুল বকেয়া, পাট সরবরাহের টেন্ডার নিয়ে নানা সিন্ডিকেট ও প্রতিযোগিতা, শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কাক্সিক্ষত মনে হচ্ছে না।  
অবশ্য বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এখন মুখ্য আলোচনার বিষয়। সে হিসেবে অনেক দেশেই পাটপণ্যের নতুন চাহিদা সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে। কিন্তু পাট খাত নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা হলেও বৈশ্বিক এসব সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্গঠিত হয়নি দেশের পাট খাতসংক্রান্ত নীতিমালাও। দেশে পাট খাতের ব্যবস্থাপনার জন্য বিদ্যমান নীতিটি প্রণীত হয়েছিল ২০১১ সালে। এরপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নানা পরিবর্তন হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ে উন্নীত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা খাতে সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। এছাড়া এসডিজি ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উন্নয়নের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে যুক্ত করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে বিদ্যমান পাটনীতির রয়েছে বিভিন্ন অসামঞ্জস্য। ছয় বছর ধরে নতুন পাটনীতি প্রণয়নে বহুবার বৈঠক হয়েছে, কিন্তু তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। জানা গেছে, ২০০২ সালে ঘোষিত পাটনীতিকে সর্বশেষ ২০১১ সালে হালনাগাদ করে সরকার। সর্বশেষ প্রকাশিত ওই পাটনীতিতে বলা হয়, ‘পাটশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে পাটনীতি যুগোপযোগী ও পরিমার্জন করে প্রণীত হলো।’ পরে ২০১৪ সালে পুনরায় পাটনীতি হালনাগাদ করার জন্য একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু সেটি চূড়ান্ত করা হয়নি। পরে ২০১৬ সালে নতুনভাবে পাটনীতি হালনাগাদ করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ফের পিছিয়ে যায়। তারপর আর কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে টেকসই উন্নয়নের সমন্বিত ধারণার সঙ্গে পাটকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সেজন্য প্রচারের পাশাপাশি বাস্তবায়নে গতিশীলতা আশা করছেন তারা।

Disconnect