ফনেটিক ইউনিজয়
বাদীর সমাধি হয়, মামলার বিচার শেষ হয় না
জয়নাল আবদিন

সারা দেশে ৩৩ লাখেরও বেশি মামলা-মোকদ্দমা বিচারাধীন। দেওয়ানি, ফৌজদারি এসব মামলার নিষ্পত্তি হতে কত বছর লাগবে, তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল ১৩ লাখ ৪৬ হাজার দেওয়ানি মোকদ্দমা, বাদবাকি ফৌজদারি মামলা।
ব্রিটিশরাজ প্রথম জর্জ কর্তৃক ১৭২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চার্টার বা রাজকীয় সনদ ঘোষণাই ছিল ব্রিটিশ ভারতে ইংলিশ ‘ল’ তথা আধুনিক আইনের প্রবেশপথস্বরূপ। ১৭২৬ সালের চার্টারের অধীনে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে প্রথম মেয়র আদালত স্থাপিত হয়। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠিত মেয়র আদালতের দেওয়ানি মোকদ্দমার বিচার শুনানি ও রায় প্রদানের ক্ষমতা ছিল। ১৮৫৯ সালে সর্বপ্রথম ব্রিটিশ শাসকদের হাতে আমাদের বিদ্যমান দেওয়ানি কার্যবিধির যাত্রা হয়। ১৯০৮ সাল পর্যন্ত দেওয়ানি কার্যবিধি বহুবার সংশোধন হয়ে বর্তমান অবস্থায় আসে। ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধি ও ১৮৮৭ সালের দেওয়ানি আদালত আইন দিয়েই আমাদের দেওয়ানি বিচারব্যবস্থা চলছে। এ আইন বিচারপ্রার্থীকে দ্রুততম সময়ে প্রতিকার তো দিতে পারছেই না, বরং বিচারপ্রার্থীদের আদালত আঙিনায় দীর্ঘ সময় টানাহেঁছড়া করে নিঃস্ব করে দিচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদীর সমাধি রচিত হচ্ছে, তবু মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বিচারপ্রার্থী মানুষ বংশপরম্পরায় জড়িয়ে আছে আইনের বেড়াজালে। দেওয়ানি কার্যবিধির আয়ু এখন ১৫৮ বছর। দেওয়ানি আদালত পরিচালনা আইনের বয়স ১৩০ বছর, যা ছিল পদ্ধতিগত আইন বা প্রসিডিউরাল ল। ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের বয়স এখন ১৪০। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের বয়স এখন ১৪৫ বছর। ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বয়স ১৩৫ বছর। ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের বয়স এখন ১০৯ বছর। ১৫৮ বছরে এ ভূখণ্ডে কত শাসকের অদলবদল হলো, দুবার এ দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু যুগের দাবিতে, নিজেদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে আইনের যুগোপযোগী পরিবর্তন, সংশোধন ও সংস্কার হয়নি। মাঝে মধ্যে যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে, তা সময়োপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি, সেটি দেওয়ানিই হোক আর ফৌজদারিই হোক।
দেশের সিভিল বিচারব্যবস্থার এ অচলায়তন সম্পর্কে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘ব্যবহার অনুপযোগী দেওয়ানি কার্যবিধি’। বিচারপ্রার্থী মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই, দিন দিন মামলাজট বাড়ছে। মামলা নিষ্পত্তির হারে এত ধীরগতি যে, বিচারিক আদালতে একটি দেওয়ানি মোকদ্দমার ফয়সালা হতে সময় লাগে ৮-১০ বছর। বিচারিক আদালতের পর আপিল পর্যায়ের শেষ ধাপ পর্যন্ত আইনের চাকা ঘুরতে ঘুরতে বিচারপ্রার্থী আর ধরাধামে থাকেন না, পরপারে চলে যান। স্বল্প সময়ে মামলা নিষ্পত্তির পথে বড় বাধা ব্রিটিশ প্রণীত প্রাচীন দেওয়ানি আইন।
আদালতের সংখ্যা বাড়ানো, বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, দক্ষ প্রশাসনব্যবস্থার কথা বিভিন্ন সময় আলোচিত হলেও সমাধানের জন্য সমস্যার গভীরে মূলে আঘাত করাটা জরুরি। মোবাইলে ক্লিক করলে দুনিয়ার এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে যোগাযোগ করা যায়, অথচ আদালতের সমন বা নোটিস সদরঘাট থেকে গুলিস্তান আসতে মাসের পর মাস সময় লাগে। ঔপনিবেশিক শাসকেরা তাদের শাসন কাঠামোর অনুকূলে যে আইন ও বিধিবিধান তৈরি করেছিল, তার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা জনগণের জন্য এক ধরনের পরাধীনতারই শামিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অভ্যন্তরীণ পরাধীনতা’।
দেওয়ানি মোকদ্দমা আদালতে নিবন্ধিত হওয়ার পর বাদী যেসব ব্যক্তিকে বিবাদী করে মোকদ্দমা দায়ের করেন, তাদের আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তলব করা হয়। আইনের ভাষায় একে ‘সমন জারি’ বলা হয়। দেওয়ানি কার্যবিধির ৫ আদেশের ৩০টি বিধির মাধ্যমে সমন জারির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। দেড় শতাব্দী আগের বিধিবিধানের বেড়াজালে আটকা পড়ে দেওয়ানি মোকদ্দমায় সমন জারিতেই শুধু সময়ক্ষেপণ হয় বছরের পর বছর। আমরা একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে বাস করে এখনও সেই জরাজীর্ণ অচল পুরনোকেই আঁকড়ে ধরে আছি। দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাদেশ সময়ক্ষেপণের আরেক ধাপ। এতে মোকদ্দমাটি ঘুমিয়ে থাকবে বছরের পর বছর। নিষেধাজ্ঞাদেশ নিয়ে টানাটানি চলতে থাকে আপিল বিভাগ পর্যন্ত। কার্যবিধির ৩৯ আদেশে ১০টি বিধির মাধ্যমে অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের যে পদ্ধতি প্রচলিত আছে, সেটি বদলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ বা সময়োপযোগী বিধিবিধান প্রণয়ন করতে না পারলে দেওয়ানি বিচার প্রক্রিয়াকে সময় নষ্টের গহব্বর থেকে টেনে তোলা সম্ভব নয়। এ প্রকারের মোকদ্দমা আদালতে বিচারাধীন থাকে বংশপরম্পরায়। কেউ বণ্টনের মোকদ্দমা দায়ের করে গেলে পরবর্তী তিন প্রজন্মেও মোকদ্দমা নিষ্পত্তির দেখা মেলে না। কালেভদ্রে মামলার রায় ডিক্রি হলেও তা কার্যকর করার জন্য আরেক প্রকার মোকদ্দমা দায়ের করার প্রয়োজন হয়। যাকে বলা হয় ডিক্রি জারি মোকদ্দমা। এখানেও ইচ্ছে করলে কোনো পক্ষ মোকদ্দমাটি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখতে পারেন।
দেওয়ানি কার্যবিধি মামলার বহুতা বা মাল্টিপ্লিসিটি অব স্যুট রোধ করতে পারে না, বরং এক খণ্ড জমির বিরোধ নিয়ে একাধিক মোকদ্দমা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেমন- এক খণ্ড জমির দলিল কোনো এক ব্যক্তির নামে, তাকে অন্য কেউ জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা বেদখল করে দিল। এখন বেদখলকৃত ব্যক্তিকে সম্পত্তির মূল্যানুসারে কোর্ট ফি দিয়ে দখল উদ্ধারের মোকদ্দমা করতে হবে। যে ব্যক্তি জমিটি দখল করেছেন, তিনি তার দখলিস্বত্বে কেউ যেন বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে, তা প্রতিরোধের জন্য মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। দুই ব্যক্তির পৃথক আদালতে মোকদ্দমা দায়েরের অবারিত সুযোগ রয়েছে। অন্য কোনো ব্যক্তিও একই সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা অন্য কোনো সূত্রে স্বত্ব দাবি করে ভিন্ন মোকদ্দমা দায়ের করতে পারবেন। দেওয়ানি আইন এ সম্পর্কে নীরব থেকে একটি বিরোধ নিয়ে একাধিক মামলা-মোকদ্দমার পথ উন্মোচন করে। গোটা দেওয়ানি বিচারব্যবস্থাটাই দ্রুতবিচার মীমাংসার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ আইনের আমূল সংস্কার বা বদলানো না গেলে আদালত ও বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো অথবা দক্ষ প্রশাসন দিয়ে এ মামলাজট খোলা সম্ভব হবে না। সময় বদলেছে, আমরা আমাদের আইন-আদালত বদলাতে পারিনি। মামলাজটের মূল সংকটটা সেখানেই।

Disconnect