ফনেটিক ইউনিজয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্লিপ্ততা
ব্যাংকিং খাতে অশনিসংকেত
ইমদাদ হক

কয়েক মাস আগেও বলা হচ্ছিল, অলস টাকা গড়াগড়ি খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে। সে চিত্রটা পাল্টে গেল হঠাৎ করেই। বলা হলো, নগদ টাকার অভাবে চলতে পারছে না বেসরকারি ব্যাংকগুলো। চেক নিয়ে ফেরত আসছেন গ্রাহকরা। মাত্র ৫ লাখ টাকা ঋণ দিতেও সক্ষমতা হারিয়েছে বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ ব্যাংকই।
সমাধানে ব্যাংক মালিকরা এক জোট হয়ে দাবি জানালেন সরকারের কাছে। সরকার বাহাদুরও খানিকটা উদার হয়েই সরকারি দপ্তর থেকে তাদের অর্থ জোগানের সিদ্ধান্ত নিল। এখন থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিতে পারবে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এখানেই শেষ নয়, সব ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) রাখতে হয়, তাও ১ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে সরকার। তবে এর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুদ্রানীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে সিআরআর। এ বিষয়ে বিশ্বের সব বড় ব্যাংকই ব্যাপক আলাপ-আলোচনা করে এ হার নির্ধারণ করে। আর্থিক ব্যবস্থা ঠিক রাখতে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশে সিআরআর কমানোর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কোনো রকম নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই। রাজধানীর একটি বেসরকারি হোটেলে ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। হোটেলের এক রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, বিএবি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা ও আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ব্যাংকিং রীতিনীতি উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া কতটা গ্রহণযোগ্য, সে ব্যাপারে অবশ্য কোনো মন্তব্য করেননি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
এ সিদ্ধান্ত অনুসারে, যেকোনো সরকারি সংস্থা তার তহবিলের অর্ধেক রাখবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আর অর্ধেক রাখবে বেসরকারি ব্যাংকে। আগে তহবিলের ৭৫ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাখার নিয়ম ছিল। আর সিআরআর কমানোর কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে যাবে এখন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, ‘আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ব্যাংক মালিকরা সিআরআর ৩ শতাংশ কমিয়ে আনার দাবি জানিয়েছিলেন। এটা কমানোর কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। আমি যদিও এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বলতে পারি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই। সভায় অনেক আলাপ-আলোচনার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।’ এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশাবাদ মন্ত্রীর।
বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার জানান, ১ শতাংশ সিআরআর কমানো হলে ১০ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে আসবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এ টাকা বেসরকারি ব্যাংকেরই টাকা। ১০ বছর ধরে নিজের কাছে রাখলেও এ টাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো উপকার হয়নি। মূল্যস্ফীতি কমাতেও কোনো ভূমিকা রাখেনি সিআরআরের টাকা। আমরা বললাম, যেহেতু এ টাকা কোনো ভূমিকা রাখছে না, অলস পড়ে আছে, আমাদের দিয়ে দিন।’ সিআরআর কেন কমাতে হবে, জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কমাতে হবে এ কারণে যে, চাইলেই তো অন্য কোনো জায়গা থেকে টাকা পাওয়া যাবে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাত বিশ্লেষণ করবে। সিদ্ধান্ত নিলে তারাই নেবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জোর করে এ সিদ্ধান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি নিয়মবহির্ভূত। চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবাদ করা দরকার ছিল। তারাও ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতিতে নানা অনিয়মের ফলে তাদের তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে।’
এদিকে সিআরআর কমানোর ঘটনায় অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়মের আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এ সুবিধার ফলে বেসরকারি ব্যাংকে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার সরবরাহ বাড়বে। এ অর্থ থেকেই ঋণ নেবেন উদ্যোক্তারা। তবে নির্বাচনী বছরে যেহেতু পরিস্থিতি উত্তালের আশঙ্কা থাকে, তাই তারা বিনিয়োগ করবেন না। এতে অর্থ পাচারের শঙ্কা বেড়ে যায় বহুগুণ।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাই অনুমোদন করে চিঠি দিয়ে দিল। এ চিঠি লেখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দরকার নেই বলে মন্তব্য অর্থনীতি বিশ্লেষকদের। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ফারমার্স ব্যাংকের মতো একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটছেই। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের কেলেঙ্কারি তো আছেই, বাদ নেই বেসরকারি ব্যাংকও। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে একটিরও অবস্থা উঠে আসেনি। আবার এ রকম ঘটনার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণার গ্রহণযোগ্যতাও হারাবে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের।
ব্যাংকের মোট মূলধনের ৯০ শতাংশই আসে আমানতকারীদের কাছ থেকে। ১০ শতাংশের মালিকানা বিএবির সদস্যদের। কিন্তু সেই ১০ শতাংশের ক্ষমতা ব্যবহার করেই ৯০ শতাংশ আমানতের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে যাচ্ছেন তারা। নির্বাচনের বছরে এসে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত হয়ে রইল এ ঘটনা, যাতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সুবিধা দেয়া হচ্ছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও ব্যাংক কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের।’

Disconnect