ফনেটিক ইউনিজয়
শেষ পর্ব
প্রয়োজন সমন্বয় : আজও সম্ভাবনা আছে পাটে
জাকারিয়া পলাশ

একসময় বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। এখনও বাংলাদেশের রফতানি আয়ে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং উপকরণ হিসেবে এখনও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের পাট। পাটশিল্পের ঐতিহ্য আর বর্তমান সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ শেষ পর্ব

পাট শিল্পের ইতিহাস ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার আপাতত সমাপ্ত হচ্ছে আজ। গত ১৩ পর্বে এ শিল্পের নানা সংকট ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও অনুসন্ধান করার চেষ্টা ছিল। এ আলোচনায় উঠে এসেছে পাট শিল্পের উন্নয়নে সরকারি নীতিতে নানা বৈপরীত্যের কথা। একদিকে সরকার স্বাধীনতার পর সরকারীকরণ করে আবার কিছুদিন পরই আসে বেসরকারীকরণের পদক্ষেপ। এ পরস্পরবিরোধী ভূমিকা নিয়ে আজও চলছে নীতিনির্ধারণী বিতর্ক।
সরকারি আর ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন দ্বন্দ্ব এ শিল্পকে এখন পর্যন্ত এক অনিঃশেষ দোলাচলের মধ্যে ফেলে রেখেছে। এর সমাধান জরুরি। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাস্তবতাকে এড়ানোর সুযোগ নেই। মুক্তবাজারের যে ধারায় বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে, তার বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আর অধুনা সংরক্ষণবাদের (প্রটেকশনালিজমের) বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করার সুযোগ আছে। বৈশ্বিক (গ্লোবাল) চিন্তার স্থানিক (লোকাল) বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। আবার স্থানিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগও আছে। সে সুযোগ কাজে লাগানোই এখন আসল প্রশ্ন। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্টদের বাণিজ্য কূটনীতিতে সুদক্ষ করার উদ্যোগ জরুরি।
এ পরিপ্রেক্ষিতেই আলোচনার সমাপ্তিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবায়নযোগ্য। প্রথমত, পাট শিল্পের বিকাশে সরকারি সংস্থার কাঠামো ও ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে অলাভজনক, বছর বছর লোকসানে থাকা সরকারি মালিকানাধীন পাটকলগুলোকে শুধু কর্মসংস্থানের নাম করে চালু রাখা কিছুতেই অর্থনীতির দৃষ্টিতে বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে না। সরকারি ব্যবস্থাপনাধীন পাটকলগুলোকে বেসরকারীকরণের দিকে নেয়া সময়ের দাবি। আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক করতে নীতিগত সহায়তাও দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গতিশীল ও সুদক্ষ করার কাজে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, নিরাপদ ও সুস্থ কর্মপরিবেশ এক বড় প্রশ্ন। পাট খাতের শ্রমিকরা কিছুতেই সে প্রত্যাশিত কর্মপরিবেশ পাচ্ছে না। বেসরকারি মালিকানাধীন পাটকলে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি এখনো ৪ হাজার ৩৮০ টাকা, যা পোশাক খাতের চেয়ে কম। এছাড়া ধুলোবালি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ করতে হয় পাটকলে। এ কারণে দিন দিন পাটকলে কাজ করার আগ্রহ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন পাটকলে ১০ থেকে ২০ শতাংশ শ্রমিক ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মালিকরা জানিয়েছেন। সাদাত জুট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হক সাম্প্রতিক দেশকালকে জানান, ‘সার্বিকভাবে পাটকলগুলোয় শ্রমিক সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তবে শ্রমিক সংকট সর্বত্র সমান নয়। শিল্প এলাকায় অন্যান্য শিল্পে শ্রমিকদের কাজের সুযোগ থাকায় পাটকলে শ্রমিক সংকট বেশি। কিন্তু এ শিল্পকে ধুলোবালিমুক্ত করাও সম্ভব নয়।’
পাট শিল্পের এ উদ্যোক্তা আরও জানান, তাদের দুটো পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদীর ঘোড়াশালে অবস্থিত জনতা জুট মিলে শ্রমিক সংকট রয়েছে। সেখানকার শ্রমিকরা অন্যান্য খাতের কারখানায় কাজের সুযোগ পেলে চলে যান। অন্যদিকে কুমিল্লায় অবস্থিত কারখানার আশপাশে অন্যান্য শিল্পকারখানা না থাকায় শ্রমিক সংকট তেমন একটা নেই।
সূত্রমতে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ অনুসারে প্রতি পাঁচ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালের গেজেট অনুসারে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকল শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণ করা হয়। সে অনুসারে পাটকলের বিভিন্ন পদের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৪ হাজার ৩৮০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকা। এজন্য নির্ধারিত মাসিক কর্মঘণ্টা হচ্ছে ২০৮ ঘণ্টা বা ২৬ দিন। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের গেজেটে পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ছিল ৫ হাজার ৩০০ টাকা, যা পাট খাতের মজুরির চেয়ে প্রায় হাজার টাকা বেশি।
এদিকে সরকারি পাটকলগুলোয় শ্রমিক সংকট না থাকলেও মজুরি বকেয়ার কারণে অসন্তোষ এখন নৈমিত্যিক। চাকরি স্থায়ী না করা, সপ্তাহের পর সপ্তাহ বেতন ও মজুরি না দেয়ায় খুলনা অঞ্চলের পাটকলগুলো বারবার আলোচনায় আসে। চার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিককে তাদের পাওনা হিসাব বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এছাড়া সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) পাটপণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের মজুরি ও পরিবেশের ক্ষেত্রে কোনো মানদ- অনুসরণ করে না। পাট খাতকে বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে শ্রমিকস্বার্থের প্রশ্নটি সমাধান করতেই হবে।
তৃতীয়ত, সময়ের পরিবর্তনে সর্বাধিক আলোচিত প্রশ্ন হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ পাটপণ্য। রফতানির বৃহৎ শেয়ার এখনও পুরনো ধাঁচের সুতা আর বস্তা। নতুন নতুন বৈচিত্র্যপূর্ণ পাটপণ্যের রফতানি বাড়াতে হলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও আবিষ্কারের বিকল্প নেই। অটোমেশন এখন একমাত্র উপায়। সেক্ষেত্রে নতুন এসব উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আড়ং, অঞ্জন’স, কারুপণ্যের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। সুষম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে এ খাত জনবান্ধব হতে ব্যর্থ হবে। এজন্য সুষম প্রতিযোগিতার পরিবেশের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। আর এ কাজে দায়িত্ব নিতে হবে সরকারি সংস্থাকেই।
সর্বোপরি পাট খাতের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থা ও ব্যক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। দেশভিত্তিক রফতানির অবস্থা যাচাইয়ের পাশাপাশি কোনো দেশের পণ্য রফতানিতে কী ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে, তা সমাধান করা দরকার। এজন্য ন্যূনতম রফতানি মূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বাংলাদেশ ব্যাংক, কাস্টমস ও রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আহরণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন করতে হবে। মানসম্মত তথ্যভাণ্ডার সৃষ্টির জন্য সরকারি ও বেসরকারি পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল করতে হবে। তাহলে টেকসই উন্নয়নের যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে, তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবারও পাটপণ্য বিশ্ববাজারে নতুনভাবে বাজার বিকাশ করতে সক্ষম হবে।

Disconnect