ফনেটিক ইউনিজয়
বন্দুকযুদ্ধ
এবার ১৫ বছরের কিশোর
আমীন আল রশীদ

জঙ্গি দমন, দুর্ধর্ষ অপরাধী বা সুন্দরবনের দস্যু নিধনে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বেশ কার্যকর ওষুধ হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করা হলেও, এবার যখন খোদ রাজধানীতে ১৫ বছরের এক কিশোর কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলো, তখন বিষয়টি নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, রাজধানীর ওয়ারীতে ৫ এপ্রিল মধ্যরাতে রাকিব হাওলাদার নামে ১৫ বছরের এক কিশোর কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পুলিশের ওয়ারী জোনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার শামসুজ্জামান সাংবাদিকদের যা বলেছেন, তা আর দশটা কথিত বন্দুকযুদ্ধের মতোই। তার ভাষ্য, ‘অপরাধীরা ঘটনাস্থলে ছিনতাই করছে অথবা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন সময় আমাদের টহল দল সামনে এগিয়ে যায়। ওরা আক্রমণ করে। টহল দল শটগানের গুলি ছোড়ে। পাল্টা গুলি করে ওরা। পরে সবাই পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সে কয়েকটা মামলার আসামি।’ সাংবাদিকরা নিহত রাকিবের বয়স নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘বয়স প্রমাণের বিষয়। হতে পারে তার বয়স ১৫, ১৬, ১৮ এমনকি ২০ও হতে পারে।’
পুলিশ কর্মকর্তার এ বক্তব্য কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়-
১. পুলিশ প্রথমে বলেছে, সে ছিনতাইকারী। পরে বলল, সে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র তালহা হত্যা মামলার মূল আসামি।
২. পুলিশ প্রথমে দাবি করেছে, নিহতের বয়স ২২। কিন্তু পরিবার থেকে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদ বলছে, তার বয়স ১৫। আবার পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, তার বয়স ১৫, ১৬, ১৮ এমনকি ২০ও হতে পারে।
৩. ‘অপরাধীরা’ ছিনতাই করছিল অথবা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার মানে পুলিশ এখানে নিশ্চিত নয়, আসলেই তারা কী করছিল।
৪. সেখানে আসলে কতজন ছিল? পুলিশ বলছে যে, সবাই পালিয়ে যায়।
৫. পুলিশ কখন জানল যে, নিহত রাকিব কয়েকটি মামলার আসামি? নিহত হওয়ার পরে?
৬. সবাই পালিয়ে গেল, অথচ সেখানে কাকতালীয়ভাবে এ ছেলেটাই গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকল?
৭. রাকিবের পরিবার বলছে, পুলিশ তাকে আরও দুদিন আগেই ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু তার মা অসংখ্যবার থানায় গিয়েও ছেলের দেখা পাননি। তার মা যে মিথ্যা বলছেন না, ভিডিও ফুটেজে তার আর্তনাদ দেখে বোঝা যায়। একজন সন্তানকে নিয়ে কোনো মা এমন মিথ্যাচার করেন না; তাতে সন্তান যত বড় অপরাধীই হোক। সুতরাং এসব সমীকরণে এটা স্পষ্ট যে, বন্দুকযুদ্ধের এ ঘটনাটি আর দশটা ঘটনার মতোই সাজানো এবং পুলিশের যে ভাষ্য, সেটিও একেবারেই গতানুগতিক। ধরে নিচ্ছি নিহত রাকিব অপরাধী এবং সে তালহা হত্যা মামলারও আসামি। ধরে নিচ্ছি সে ছিনতাইকারীও। পুলিশের এ দাবি সঠিক হলেও তাকে বন্দুকযুদ্ধের নামে মেরে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বলা হয়, শিশুরা অপরাধ করে না। বরং তারা ভুল করে। দেশের আইন অনুযায়ী প্রচলিত আদালতেও তাদের বিচার হবে না। তার বিচারের জন্য আলাদা আদালত আছে এবং বিচারের চেয়ে তার জন্য বেশি প্রয়োজন সংশোধন। শিশুদের সর্বোচ্চ শাস্তিও দেয়া যায় না। এমনকি তাদের হ্যান্ডকাফও পরানো নিষেধ। অথচ পুলিশ রাকিবকে ছিনতাইকারী ও হত্যা মামলার আসামি দাবি করে তাকে কোনো ধরনের বিচারের মুখোমুখি না করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সর্বোচ্চ শাস্তিটাই বরাদ্দ করল।
বিচার পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক মানুষেরই আছে। সংবিধানই সে অধিকার দিয়েছে। সুতরাং একজন শীর্ষ অপরাধীকেও প্রচলিত আদালতের বাইরে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা সুস্পষ্টভাবেই সংবিধানের লঙ্ঘন। অথচ প্রতিনিয়তই তা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে।
দেশে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনা নতুন কিছু নয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরে এ রকম বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ১৬২ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে একজন মানুষ নিহত হয়েছেন ক্রসফায়ারের নামে।
বস্তুত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের নির্মূল করার জন্যই কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের আশ্রয় নেয়। বলা হয়, অনেক সময় বড় বড় অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা কঠিন। বলা হয়, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বা জঙ্গিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার অপরাধে জড়ায়। তাছাড়া প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে অনৈতিক হলেও এ বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে অনেক বড় বড় অপরাধী নিহত হয়েছে। এভাবে এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা হয়। আর এটি যাতে আইনিভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে, সেজন্য গল্পটা সাজানো হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, র‌্যাব বা পুলিশ সবসময় একই গল্প বলে। ফলে এটি এখন আর মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। সত্যিই কোথাও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটলেও মানুষ মনে করে এটা সাজানো। এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তির। জনগণের করের পয়সায় পরিচালিত এ বাহিনীগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে যদি মানুষের মনে প্রশ্ন বা সন্দেহ তৈরি হয়, সেটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কেননা বিপদগ্রস্ত হলে মানুষ প্রথমে যাদের কাছে গিয়ে সহায়তা চাইবে, তাদের ভাবমূর্তিই যদি প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, তখন মানুষের আর দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না।
তাছাড়া শুধু অপরাধীই নয়, এ কথিত বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারের নামে বহু নিরপরাধ মানুষকেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও টাকার বিনিময়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্রসফায়ারের ১০০ জন অপরাধীকে মেরে ফেলার পর যদি একজন নিরীহ মানুষও এ ধরনের মৃত্যুর শিকার হন, সেটিই অপরাধ। যে কারণে বারবারই বলা হয় যে, প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধে নিরপেক্ষ ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ জাতীয় তদন্তের ঘোর বিরোধী।
বস্তুত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করা হলেও এটি এখন এক ধরনের বিচারিক হত্যা বা জুডিশিয়াল কিলিংয়ে পরিণত হয়েছে। যে বিচারকার্যটা পরিচালনা করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বিকল্প উপায়ে বিচার করেন। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো, দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থা কি আর কাজ করছে না? নাকি প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো আস্থা নেই?

Disconnect