ফনেটিক ইউনিজয়
বায়ুদূষণে নাকাল রাজধানী
এ আর সুমন

রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা, যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের ঠিক সামনে। সকাল থেকেই সবাই ব্যস্ত। কেউ শিশুকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, কেউবা স্থানীয় ব্যবসায় দোকান খুলতে ছুটে চলেছে। ছুটে চলেছে দূরপাল্লার পরিবহন, সমানতালে পাল্লা দিয়ে রাস্তা দখলে মেতে আছে মিরপুর ও গাবতলীগামী দুটি বাস। তবে সবার হাত মুখে, কেউবা ওড়নায় নাক চেপে ধরে রাস্তা পার হচ্ছে, কেউ কেউ মাস্ক পরে দ্রুত পায়ে জায়গাটি পার হতে চাইছে। কারণ একটাই, যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে সায়েদাবাদ রেলগেট পর্যন্ত যেন ধুলোর রাজ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কুয়াশায় ঢেকে আছে রাস্তা। তবে এটা তা নয়, এটি নগরবাসীর চরম ভোগান্তির দূষিত বায়ু, যা এ শহরের অন্যতম বড় একটি সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থায়ী পদক্ষেপ ছাড়া সমস্যাটির সমাধান সম্ভব নয়, তবে সেই সঙ্গে দরকার সচেতনতা।
মেগাসিটির শহর হিসেবে খাতায় ঢাকার নাম বেশ আগেই উঠেছে। তবে সে নামে কালিমা জুড়ে দিয়েছে বসবাস অযোগ্য নগরীর তকমা। বসবাস অযোগ্যতার মূলে বায়ুদূষণ কোনো অংশে কম ভূমিকা রাখছে না। সারা বিশ্বের ৬৭টি দেশের ৭৯২টি শহরের বাতাসের মান নিয়ে গত সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যেখানে মেগাসিটিগুলোর মধ্যে দূষণের দিক দিয়ে রাজধানী ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১৬ সালে ঢাকা শহরের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০ মাইক্রোমিটার ব্যাসের ভাসমান বস্তুকণার বার্ষিক গড় পরিমাণ ছিল ১০৪ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৫ সালে ছিল ১৪৫ ও তার আগের বছর ১৫০ মাইক্রোগ্রাম। প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের ভাসমান বস্তুকণার বার্ষিক গড় পরিমাণ ২০১৬ সালে ৫৭ মাইক্রোগ্রাম, ২০১৫ সালে ৮২ ও তার আগের বছর ৮৫ মাইক্রোগ্রাম ছিল। ডব্লিউএইচওর আদর্শ মান অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম১০-এর পরিমাণ ২০ মাইক্রোগ্রামের কম ও পিএম২ দশমিক ৫-এর পরিমাণ ১০ মাইক্রোগ্রামের কম হলে তাকে স্বাস্থ্যসম্মত বাতাস বলা যায়। ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করে, এমন ১১টি মেগাসিটির ২০১১-১৫ সালের বায়ু মান বিচার করে গড় দূষণের যে গ্রাফ ডব্লিউএইচও প্রকাশ করেছে, সেখানে ঢাকার অবস্থান দাঁড়িয়েছে ভারতের দিল্লি ও মিসরের কায়রোর ঠিক পরে, অর্থাৎ তৃতীয় অবস্থানে। ডব্লিউএইচও বলছে, বিশ্বের শহর এলাকার বাসিন্দাদের ৮০ শতাংশ যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, তা ওই স্বাস্থ্যসম্মত সীমার মধ্যে পড়ে না। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের শহরগুলোর ৯৮ শতাংশই বায়ুদূষণের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়ার কারণে এসব এলাকায় হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যু হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভল্যুশনের যৌথ উদ্যোগে গত ডিসেম্বরে ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। শীর্ষে ছিল ভারতের রাজধানী দিল্লি।
সহজ প্রশ্ন, কেন বাড়ছে বায়ুদূষণ? বিশ্বের ভূভাগে ন্যূনতম চার ভাগের এক ভাগ বনাঞ্চল থাকা অত্যাবশ্যকীয়। উন্নত দেশগুলো এ হার বজায় রাখতে পারলেও বাংলাদেশের মতো দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশের পক্ষে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে অনেক কম। পাশাপাশি ইটভাটা, অনিয়ন্ত্রিত শিল্প ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণজনিত দূষণের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর প্রায় ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ইট তৈরি হয় প্রায় পাঁচ হাজার ইটভাটায়। এ ইট তৈরি করতে প্রায় ১০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, যা জনপ্রতি দিনে শূন্য দশমিক ২ কেজির সমতুল্য। বিশ্বব্যাংকের দেয়া তথ্যমতে, ঢাকা শহরের বাতাসে ৪০ ভাগ ক্ষুদ্র কণা আসে ঢাকার চারপাশের ইটভাটার মাধ্যমে। ঢাকার চারপাশে ইটভাটার মাধ্যমে ১৫ হাজার ৫০০ টন সালফার ডাই-অক্সাইড, ৩ লাখ ২ হাজার টন কার্বন মনোক্সাইড, ছয় হাজার টন ব্ল্যাক কার্বনের ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রতিবছর নির্গত হয়। পেট্রল ও ডিজেলচালিত যানবাহন ব্যাপক দূষণ ঘটাচ্ছে। সিএনজি বা অটোগ্যাসচালিত যানে এ দূষণ অনেকটা কম। আবার অনেক গাড়িতে ব্যবহৃত মিশ্রিত জ্বালানি প্রকট দূষণের কারণ। শহরাঞ্চলে যানবাহন ও কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া একদিকে বায়ুম-লে কার্বনের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে উষ্ণতা বৃদ্ধি করে চলেছে। উভয় দূষণের কারণে শহরাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে বসবাসরত জনমানুষ বিশুদ্ধ ও নির্মল বায়ু থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) বলছে, রাজধানী ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ভয়াবহ ধুলাদূষণের শিকার। বাকি ১০ শতাংশ এসি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করে। এছাড়া নগরীতে বসবাসকারী প্রতিটা মধ্যবিত্ত পরিবারকে ধুলাদূষণের কারণে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৪ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এ অর্থ কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসা কিংবা দূষণ প্রতিরোধে খরচ করা লাগছে।
স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব সাম্প্রতিক দেশকালকে জানান, বছর দুই আগে পরিচালিত ঢাকা শহরের ছয়টি স্কুলে শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতার ওপর এক গবেষণা চালানো হয়েছিল। তবে ফলাফল যা আসে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। বায়ুদূষণের এ পরিস্থিতির কারণে অনেক শিশুর ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। এসব শিশুর বেশির ভাগেরই বয়স ১৪ বছরের মধ্যে। যেসব স্কুলে এ গবেষণা চালানো হয়, সেখানকার ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণ মাত্রায় কাজ করছে না। ফুসফুসের ৭০-৮০ শতাংশ কাজ করছে। আর এ ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বায়ুদূষণ।
দূষণের কারণে জীবন দুর্বিসহ উঠলেও অনেকটা যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে নগরবাসী। ছায়েদুল হক নামে রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার একজন বাসামালিক বেশ আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘বাড়ির সামনে মেইন রোড, অসহ্য ধুলো, পরিবেশের কারণে এ বাসায় তো কেউ থাকতেই চায় না। বাসা থেকে জানালা খুলে নিশ্বাস নেয়ার উপায় নেই।’ তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, সমস্যা মোকাবেলায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কেবল সরকার নয়, দায়িত্বরত সব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এগিয়ে এলে এ শহর বসবাস উপযোগী হয়ে উঠতে পারবে।

Disconnect