ফনেটিক ইউনিজয়
৫ মাসে নিহত ১৫
আঞ্চলিক দলের বিরোধে উত্তপ্ত পাহাড়
সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি
রাঙামাটির নানিয়ারচর সড়কে অজ্ঞাত আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাসহ পাঁচজন
----

সবুজ অরণ্যঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ১৯৯৮ সালে ‘শান্তিচুক্তি’-পরবর্তী সময়ে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে পার্বত্য এলাকার সাধারণ মানুষ। অতীতে পাহাড়ের হত্যাকাণ্ড জঙ্গলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তা এখন প্রকাশ্যে রাজপথে সংঘটিত হচ্ছে। গত পাঁচ মাসে পার্বত্য এলাকায় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে প্রাণ গেছে ১৫ জনের। একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাসহ হত্যার দীর্ঘ মিছিল জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। বর্তমানে পাহাড়জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজমান। উল্লেখ্য, শুক্রবার নানিয়ারচরে প্রতিপক্ষের গুলিতে পাঁচজন মারা যাওয়ার ঘটনা ‘শান্তিচুক্তি’-পরবর্তী সময়ের অন্যতম বৃহৎ হত্যাকাণ্ড। তবে ঘটনাগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাঙামাটির নানিয়াচর, বাঘাইছড়ি, খাগড়াছড়ি সদর, দীঘিনালাসহ কয়েকটি উপজেলায় অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।  
সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পরবর্তী সময়জুড়ে নানিয়ারচর উপজেলা প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০০৮ সালে জেএসএস (এমএন লারমা) সৃষ্টির পর থেকেই শক্তিমান চাকমার নেতৃত্বে নানিয়ারচরে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়। গত দুই বছরে নানিয়ারচরে ইউপিডিএফের আধিপত্য অনেকটাই হ্রাস পায়। এদিকে তপন জ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সৃষ্টির পর নানিয়ারচর এলাকায় অনাদি ও অনীল বিকাশ নামে ইউপিডিএফের দুই নেতা নিহত হন। এছাড়া হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দুই নেত্রী দয়াসোনা ও মন্টি চাকমাকে নানিয়ারচর থেকেই অপহরণ করা হয়। কার্যত নানিয়ারচর এলাকাটিতে দীর্ঘদিন পর নিজেদের প্রভাব হারায় প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ। দলটি (ইউপিডিএফ) তার দুর্গ এলাকায় পুরনো আধিপত্য ফিরে পেতে মরিয়া ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
বৃহস্পতিবার শক্তিমান চাকমা ও শুক্রবার আরও পাঁচজনের মৃত্যুতে আবার আলোচনায় এসেছে হ্রদ ও পাহাড়বেষ্টিত নানিয়ারচর। এর আগে একাধিক হত্যাকাণ্ডে রাঙামাটির নানিয়ারচরে আনাদি রঞ্জন, অনিল বিকাশ, খাগড়াছড়িতে পিসিপির (পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ)  সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মিঠুন চাকমা, খাগড়াছড়ির রাঙাপানি ছড়ার দিলীপ চাকমা নিহত হন। এদিকে এপ্রিলের ১৫-২২ তারিখ পর্যন্ত চারজন খুন হলেও দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাঁচ মাসে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে খুন হন ১৫ জন। নিহতদের সবাই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সদস্য।
পাহাড়ে অব্যাহত হত্যাকাণ্ডে শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে কেবল রাজনৈতিক কর্মীই নন, একই সঙ্গে নিহত হচ্ছেন দলের সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। শুক্রবার নানিয়ারচরে নিহত হন সজীব (৩৪)। ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাসের চালক হিসেবে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (এমএন লারমা) নেতাদের নানিয়ারচরে নিয়ে যাওয়ার সময় সবার আগে গুলিবিদ্ধ হন সজীব হাওলাদার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনের মানুষকে হারিয়ে দিশেহারা সজীবের পিতা বজলু হাওলাদার। স্বামীকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল স্ত্রী মৌসুমী আক্তার। সজীবের শিহাব নামে সাত বয়সী এক পুত্রসন্তান রয়েছে।
এদিকে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত খাগড়াছড়ির মহালছড়ির বাসিন্দা সেতু দেওয়ানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকে বিহ্বল পুরো পরিবার। সেতুকে হারিয়ে শোকে মুর্ছা যাচ্ছে তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শক্তিমান দেওয়ান ও মা শিক্ষিকা পুলকিত খীসা। বাবার ছবি দেখে কাঁদছে সেতুর বড় ছেলে কৃতার্থ দেওয়ান (৭)। সেতুর স্ত্রীর কোলে রয়েছে এক বছরে অবুঝ শিশু নিঝুম দেওয়ান। শোকের মাঝে পরিবার ও গ্রামজুড়ে রয়েছে আতঙ্কের ছাপ। পুরো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র পহারা। পরে পুলিশি প্রহরায় সেতুর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। স্বজনরা বলেন, ‘সেতু সম্প্রতি জেএসএসের (এমএন লারমা) রাজনীতিতে যুক্ত হয়। তার কিছুদিনের  মধ্যেই নিহত হলেন তিনি।’
কড়া পুলিশি পাহরায় খাগড়াছড়ি জেলা সদরের তেঁতুলতলায় ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা), সুজন চাকমা ও তনয় চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে জেএসএসের (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সদস্য বিভুরঞ্জন চাকমা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি ও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রসীত খীসা পুনঃস্বায়ত্তশাসনের কথা বলে আজকে যে আন্দোলন করছেন, তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ মানুষের কাছে নেই।’ এ সময় তিনি ইউপিডিএফের কার্যক্রম সমূলে পরিত্যাগ করার দাবি জানান।
খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাউদ্দিন বলেন, ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি পাহারায় নিহত চারজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার শক্তিমান চাকমা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাহাড়জুড়ে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই আবার পাঁচজন খুন হন রাঙামাটির নানিয়ারচরে। এ ঘটনায় আরও আটজন আহত হন। উভয় হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। তবে ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরণ চাকমা হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। এর সঙ্গে ইউপিডিএফের কোনো সংযোগ নেই।’
পাহাড়ে চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের কার্যক্রম রয়েছে। সরকারের মধ্যে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালে জেএসএস থেকে বেরিয়ে এসে আত্মপ্রকাশ করে ইউপিডিএফ। জেএসএসের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) সাবেক সভাপতি প্রসীত খীসা দলটির নেতৃত্ব দেন। ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এনে ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) আত্মপ্রকাশ ঘটে, যার নেতৃত্ব দেন ইউপিডিএফের  সাবেক সামরিক শাখার প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা। তবে ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) এ সময় আলবদর-রাজাকারের সঙ্গে তুলনা করেন ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠক মাইকেল চাকমা।
এদিকে গতকালের হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পাহাড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। হত্যাকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পর্যটনসহ অন্যান্য খাতে। খাগড়াছড়ির সাজেকে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটক ঘটনার পর পরই শহর ছেড়েছে। এদিকে শনিবার সকালেও একাধিক হোটেলে বুকিং বাতিল করেছে পর্যটকরা। খাগড়াছড়ি গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক নবীন ত্রিপুরা বলেন, “শুক্র ও শনিবার আমাদের সাধারণ হোটেলে সবক’টি রুম বুকিং থাকে। তবে নানিয়ারচর হত্যাকাণ্ডের পর অনেকে শুক্রবার রাতেই বুকিং বাতিল করেছে।”

Disconnect