ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব ২
দুর্ঘটনায় পুষিয়ে যায় মালিকের ক্ষতি, ক্ষত রয়ে যায় শ্রমিকের
ইমদাদ হক

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি মোটাদাগে দেশের পোশাক কারখানার নিরাপত্তাহীনতার ছবিটাই তুলে ধরে। এরপর কারখানা সংস্কারে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। সাফল্যও আসছে মোটাদাগে। তবে কারখানার উন্নত পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ শ্রম দেয়ার মতো শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের পদক্ষেপ রয়ে গেছে অধরাই। অথচ ৩০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি বাণিজ্য তিলে তিলে গড়ে উঠেছে শ্রমিকশ্রেণির নিরন্তর ঘামেই। পোশাক কারখানার উৎপাদন আর শ্রম সক্ষমতার সর্বশেষ হালহকিকত অনুসন্ধান করার চেষ্টা হবে এ সিরিজ লেখায়। আজ দ্বিতীয় পর্ব

সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়া শ্রমিকদের অর্থসহায়তার পরিমাণ একেক রকম। ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন কেউ, কেউবা পেয়েছেন কেবল চিকিৎসার খরচ। আবার আর্থিক সহায়তা না পাওয়া শ্রমিক বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যাও কম নয়। তবে আইনিভাবে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি রয়ে গেছে আড়ালেই। অথচ ওই ভবনের মালিক সোহেল রানাকে শুধু দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে খাতা-কলমেই, যিনি রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। অভিযোগ আছে কারাগারেও তার বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তির।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পেকট্রাম বা তাজরীন কারখানাসহ যেকোনো দুর্ঘটনার পরই শ্রমিক বা বিপদগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে তৎক্ষণাৎ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। এসব অর্থ দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল, শ্রম মন্ত্রণালয়, ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, সিঅ্যান্ডএ, লিঅ্যান্ডফাং, বিজিএমইএ বা দেশি-বিদেশি ব্যক্তি কিংবা সংস্থার সহায়তায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব কার্যক্রম সমন্বয় করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তবে এসব সহায়তা আইনি কাঠামোর মধ্যে হয় না। এ সহায়তাকে ক্ষতিপূরণ বলতে নারাজ শ্রমিক সংগঠনগুলো।
দুর্ঘটনার পর ভবন মালিক সোহেল রানা, তাজরীনের মালিক দেলোয়ার হোসেন বা অন্য মালিকদের কাছ থেকে মোটাদাগে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়নি। বিভিন্ন তহবিল থেকে সংগ্রহ করা অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে বিজিএমই। তবে তারাই আবার আইনি কাঠামোয় ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর বিরোধিতাও করে। অথচ রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর থেকেই সোহেল রানা কারাগারে বসেই অন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ওই ভবনের অন্য পাঁচ কারখানার মালিকের তিনজনই নতুন করে ব্যবসা শুরু করেছেন। তাজরীনের মালিক দেলোয়ার হোসেনও পুষিয়ে নিয়েছেন অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনার অনেকটাই। একই কথা স্পেকট্রামের মালিক শাহরিয়ার কবিরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দুর্ঘটনার শিকার মালিকদের ব্যাংকঋণ মওকুফ করা হয় বিশেষ সুবিধায়। আবার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তাদের বিশেষ ঋণও দেয়া হয়। কেবল দুর্ঘটনাই নয়, অদক্ষতা, বিশ্বমন্দা বা অন্য কারণে কোনো ব্যবসায়ী তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে নিলে তার ঋণ মওকুফেও সরকারের কাছে ‘বিশেষ আবদার’ আছে বিজিএমইএর।
কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পোশাক কারখানা সংস্কারের পর বন্ধ হয়ে গেছে আড়াই হাজারের মতো কারখানা। এসব কারখানার মালিক ব্যবসার ধরন পাল্টে বহাল তবিয়তেই আছেন। অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন বিভিন্ন দেশে। তাদের প্রতি সবসময় বিজিএমইএ, সরকার বা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ‘বিশেষ আশীর্বাদ’ থাকে। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত অজুহাতে সাত শতাধিক ব্যবসায়ীর ঋণ মওকুফে সরকারের কাছে আবেদনও জানিয়েছে বিজিএমইএ। বিজিএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ নাসির বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ব্যবসা গুটানোর পর তাদের এক্সিট পয়েন্ট থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর বাসা, গাড়ি বা নিজস্ব সম্পত্তিতে কখনো হস্তপেক্ষ করা হয় না। আমাদের এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ব্যবসায়িক মন্দায় পতিত হলে ঋণ আদায়ে তার বাসাবাড়িসহ সব সম্পত্তি দখল করা হয়। ব্যবসায়ীও সমাজের একজন মানুষ। তার প্রতি অবিচার করা ঠিক নয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তাদের ঋণ মওকুফের আবেদন করা হয়েছে।’
অথচ পোশাক কারখানায় ছোটখাটো দুর্ঘটনা বলতে গেলে লেগেই আছে কয়েক বছর ধরে। এর মাঝে ঘটে গেছে বড় কয়েকটি দুর্ঘটনাও। যাতে বিশ্বব্যাপী ইমেজ সংকটেও পড়ে বাংলাদেশ। আর এসব দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই হারিয়ে যায় সময়ের আড়ালে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত সুফিয়া বেগম বলেন, দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ পেয়েছেন। এরপর আর কেউ তার খোঁজ নেয়নি। দুই ছেলেসহ সংসার পরিচালনার ব্যয় জোগাড় করতেন তিনিই। অথচ এ দুর্ঘটনার পর থেকে খেয়ে না খেয়ে তাকে দিন কাটাতে হচ্ছে। বাধ্য হয়েই ছেলে দুটোকে দিয়েছেন গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করতে। তিনি বলেন, ‘আমার ক্ষতিপূরণ চাই না, আমার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিন। নয়তো ক্ষতিপূরণ দিন, যেন অন্তত পেট পুরে খেতে পারি।’ এই সুফিয়াদের দেখা মিলবে অনেক কারখানাতেই।
তবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সব কারখানায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অর্থ ও চিকিৎসাসহায়তা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করতে তহবিল গঠন করা হয়েছে।’
এ ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে সময়। যেখানে মুখের হাসিটুকু হারিয়ে যাচ্ছে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারেই। তাই তো কেবল খাতা-কলমের হিসাব বা বিদেশী ক্রেতাদের দেখানোর জন্য নয়, প্রকৃতভাবেই শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, বেতন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের কর্মজীবনে যত টাকা উপার্জন করার কথা (লস অব আর্নিং), তার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান করতে হবে। পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশে নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণেই বিদেশি ক্রেতারা এ দেশের পোশাকের ন্যায্য দর দিচ্ছেন না। ফলে কম মজুরি বা দুর্ঘটনার পর আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন শ্রমিকরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শ্রমিকরা জীবনযাপনের ব্যয় মেটানোর ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন না। যেখানে কাজ করছেন, সেখানে রয়ে গেছে আর্থিক নিরাপত্তার সংশয়ও। দুর্ঘটনায় স্ট্যান্ডার্ড ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে মালিকদের আরও উদার হতে হবে। এতে শ্রমিকরা কাজে মনোযোগী হবেন, কারখানার উৎপাদনও বাড়বে।’ বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ বা ন্যূনতম মজুরিসহ শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনায় শ্রমিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত না করলে তাদের প্রকৃত দাবি উঠে আসবে না। এসব ক্ষেত্রে পোশাক কারখানার মালিক বা সরকারি নীতিনির্ধারকদের উদার হতে হবে।’

Disconnect