ফনেটিক ইউনিজয়
বিস্তর অভিযোগ নিয়ে খুলনায় আ.লীগের জয়
এমডি হোসাইন

জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেয়াসহ বিস্তর অভিযোগ নিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক বিজয়ী হয়েছেন। তবে সরকারের শেষ সময়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) শক্ত ভূমিকা না রাখলে খুলনা সিটির এ প্রভাব গাজীপুরসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশনেও পড়তে পারে বলে জানিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে বছরের শেষভাগে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। জানা যায়, খুলনা সিটি নির্বাচনে বাবার সঙ্গে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেও ভোট দিয়েছে। এছাড়া ২৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে তিনটি স্থগিত করা হয়েছে অনিয়মের অভিযোগের কারণে। এর বাইরে আরও কিছু কেন্দ্রে সিল মেরে বাক্স ভরার চেষ্টা ও বিএনপির প্রার্থীদের ক্যাম্প ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
খুলনায় মোট ভোটকেন্দ্র ২৮৯টি। এর মধ্যে অনিয়মের কারণে তিনটি কেন্দ্রের ভোট স্থাগিত করা হয়েছে। ফলে অনানুষ্ঠানিকভাবে ২৮৬টি কেন্দ্রের ফলাফলই পাওয়া গেছে। নৌকা প্রতীকে খালেক পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৬ ভোট।
অন্তত ১০০ কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি হয়েছে অভিযোগ তুলে সেসব কেন্দ্রের ফল বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ছেলেপেলে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছে। এ রকম কেন্দ্রের সংখ্যাও শতাধিক হবে। সেসব কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে যে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা বাতিল করতে হবে। এরপর সেখানে পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের পরিচালক আব্দুল আলীম বলেন, খুলনা সিটি নির্বাচন ভালো কিংবা খারাপ বলব না। কিছুটা অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু ফল পাল্টে দেয়ার মতো কোনো অনিয়ম দেখিনি। তবে যেটা অনিয়ম হয়েছে, সেটা সার্বিকভাবে ভালো হয়নি। কারণ নির্বাচন কমিশন শক্ত ভূমিকা না রাখলে সরকারি দল শেষ সময়ে নিজের ইমেজ রক্ষার জন্য অনেক কিছুই করার চেষ্টা করবে। এতে আসন্ন সিটি করপোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব পড়বে।
ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ভোটের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে তিনটি কেন্দ্র স্থগিত হয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোয় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। চমৎকার, সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশে খুলনায় নির্বাচন হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে খুলনার এমন ভোট জনমনে আস্থা কিংবা শঙ্কা বাড়াবে কিনা, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে এ নিয়ে মন্তব্য করব না।
এদিকে এমন ভোটগ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার রেওয়াজ থাকলেও এবার তিনি সাংবাদিকদের সামনেও আসেননি। ২ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সাংবাদিকরা তার দেখা পাননি। অথচ আগের দুটি সিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে সিইসি সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, পর্যবেক্ষকরা যে ধারাবাহিকতা না থাকার কথা বলছেন, তার পাশাপাশি গাজীপুরের ভোট পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সিইসির সংবাদমাধ্যমের সামনে না আসার কারণ হতে পারে।
খুলনার পর বাকি থাকছে চার সিটির ভোট।
৪ সেপ্টেম্বর গাজীপুর, ৮ অক্টোবর সিলেট, ৫ অক্টোবর রাজশাহী ও ২৩ অক্টোবর বরিশালের মেয়াদ ফুরাচ্ছে। তবে গাজীপুরের ভোট হবে ২৬ জুন। নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারির মধ্যে হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেজন্য আগামী জুলাইয়ের মধ্যে পাঁচ সিটির ভোট শেষ করার পরিকল্পনার কথা এরই মধ্যে জানিয়েছেন সিইসি নূরুল হুদা।
এদিকে খুলনা সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের জয়ের নেপথ্য কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকারের উন্নয়ন-অর্জনের কারণে জয় এসেছে। সমুদ্র ও সীমান্ত বিজয় হয়েছে। পারমাণবিক ক্লাবে যোগ দেয়া ও স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণে ঐতিহাসিক সাফল্যের কারণে নৌকার প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে মানুষ।
তবে খুলনা সিটি করপোরেশনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে ইসি পুনর্গঠনের আওয়াজ তুলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, নির্বাচনে যদি সেনাবাহিনী থাকত, তাহলে খুলনা নির্বাচনের এ দশা হতে না। জয়-পরাজয় আলাদা কথা। কিন্তু প্রতিপক্ষ নির্বাচন করতে পারবে না, তার এজেন্টদের বের করে দেবে। এটা নির্বাচন হতে পারে না, এটা নির্বাচন নয়। ইসি পুনর্গঠনের দাবি তুলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। আমাদের এ নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কোনোমতেই নিরপেক্ষভাবে কাজ করার যোগ্য নন। এর আমূল পরিবর্তন না হলে কোনো নির্বাচনই এখানে অর্থবহ হবে না। ফখরুল বলেন, ‘খুলনায় আমাদের শক্তিশালী সংগঠন আছে। গতবার আমাদের প্রার্থী বহু ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। খুলনা শহরের যে আসন, সে আসনে আমাদের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। সেখানে শুধু নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার কারণে পুলিশি হামলার কারণে বিএনপিকে সেখানে তারা (সরকার) দাঁড়াতেই দেয়নি।’
উল্লেখ্য, ১৫ মে ভোটের দিন রেখে গত ৩১ মার্চ গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিল ইসি। সে অনুযায়ী ভোটের প্রস্থতিও চলছিল। কিন্তু ঢাকার সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা গাজীপুর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবিএম আজহারুল ইসলাম সুরুজ রিট আবেদন করলে ৬ মে নির্বাচন তিন মাস স্থগিতের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই আদেশের বিরুদ্ধে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই মেয়র প্রার্থীর আবেদন ও নির্বাচন কমিশনের লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে আপিল বিভাগ গত বৃহস্পতিবার স্থগিতাদেশ বাতিল করে ২৮ জুনের মধ্যে ভোট করার নির্দেশ দেন। এরপর গাজীপুরে ভোটের জন্য ২৬ জুন নতুন তারিখ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

Disconnect