ফনেটিক ইউনিজয়
সুন্দরবনের পর এবার সংকটে টেংরাগিরি
মারুফ আহমেদ

সুন্দরবনের পর এবার টেংরাগিরি বনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শাঁসমূলীয় বনটির অসংখ্য গাছ এরই মধ্যে মরে গিয়েছে। কমেছে বনের আয়তন। এর মধ্যেই বনের পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ায় বনটি শুধু ক্ষতিগ্রস্ত নয়, মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশকর্মীরা।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বিভিন্ন সময় দাবি করা সত্ত্বেও টেংরাগিরি বন রক্ষায় সরকারের বন বিভাগ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এরই মধ্যে সব যুক্তি ও প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়েছে। বৃহত্তম শাঁসমূলীয় বনটির অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলে দেয়া হয়েছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব না দিয়ে সরকারের নেয়া বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পর্যায়ক্রমে দেশকে ভয়াবহ দুর্যোগ ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য ও স্বার্থ নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বরগুনা জেলা শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান থেকে পশ্চিমে এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তরে অবস্থিত টেংরাগিরি। এটি স্থানীয়ভাবে ফাতরার বন নামে পরিচিত। এ টেংরাগিরি বন থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে ৩০৭ মেগাওয়াটক্ষমতার একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরেরও কোনো ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি। অথচ পরিবেশ আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ধরনের শিল্পকারখানা করা নিষেধ। অর্থাৎ সরকার নিজেই রাষ্ট্রীয় আইন-নিয়ম মানছে না।
সম্প্রতি ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য দেশীয় কোম্পানি আইসোটেক ও দুটি বিদেশি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ কেনার জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও একটি বেসরকারি কোম্পানির মধ্যে ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে এরপর আরও একটি ৩০৭ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ এর পরিবেশগত প্রভাবই নিরূপণ করা হয়নি।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ২১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ফাতরার বন আগে সুন্দরবনের অংশ ছিল। ৫৮ বছর আগে ১৯৬০ সালে বনটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দেয় তখনকার সরকার। ২০১০ সালে বন মন্ত্রণালয় এটিকে বন্য প্রাণীর অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট টেংরাগিরি বনে রয়েছে সুন্দরী, কেওড়া, বাইন, পশুর, রেইনট্রি, জারুল, ধুন্দল, বনকাঁঠাল, বট, তেঁতুল, গেওয়া, করমচা, গরান, শিংড়া, হাররা, হেতাল, গিলালতা, কালিয়ালতা, বলাই, হারগোজা, গোলপাতাসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছ। এ বনে বানর, শূকর, শজারু, শিয়াল, বাদুর, কুকুর, বেজি, চামচিকা, গুইসাপ, গোখরাসাপ, অজগর সাপ, বাবুই, পেঁচা, বউ কথা কও, চিল, শালিক, শ্যামা, টুনটুনি, ঘুঘু, মাছরাঙা, সাদা বক, ডাহুক, দোয়েল, বুলবুলিসহ নানা প্রজাতির বণ্য প্রাণী ও পাখির বাস। এর মধ্যে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বণ্য প্রাণী প্রজাতিও আছে। গোটা বনাঞ্চল বিভিন্ন ছোট-বড় খাল দ্বারা বেষ্টিত। এসব খালগুলোতে সারা বছর জোয়ার-ভাটায় পানিপ্রবাহ থাকে। পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ বন বড় ভূমিকা রাখছে।
বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ও বনদস্যুদের ছোবলে হুমকির মুখে রয়েছে টেংরাগিরি। চোর-ডাকাতরা নির্বিচারে বনের গাছ কেটে নিচ্ছে। জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্বাসমূলে বালি জমে ও প্রচণ্ড ঢেউয়ে গাছের গোড়ার মাটি-বালি সরে গিয়ে গাছ মারা যাচ্ছে। এ রকম চলতে থাকলে বনটির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত হবে না এ রকম বনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ছাড়পত্র দেয়া। দেশের জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু তা কোনোভাবেই প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি করে নয়। সরকারকে অবিলম্বে টেংরাগিরি বনঘেঁষে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন বাতিল করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, টেংরাগিরি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে। এখন এ বন ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ জনপদ, স্থানীয় মানুষ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য হওয়ায় এখানে বনে গড়ে ওঠা সোনাকাটা ইকোপার্ক পর্যটনকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
টেংরাগিরির পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৭-এর ৭(৪) ধারা অনুযায়ী, ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত যেকোনো শিল্প স্থাপনে পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) সাপেক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘পরিবেশ ছাড়পত্র’ নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তা ছাড়াই এ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ধরনের শিল্পকারখানা স্থাপন করা নিষেধ। তা অমান্য করে একতরফা এ ধরনের উদ্যোগ সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে দেশের আইনের উদ্বেগজনক লঙ্ঘন। তবে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ দাবি করেন, পরিবেশের ক্ষতি না করেই কেন্দ্রটি নির্মিত হবে।
পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, সাধারণ ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে বোঝা যায়, কেন্দ্রটি নির্মাণের কারণে টেংরাগিরি বনের ক্ষতি নিশ্চিতভাবেই হবে। এর আগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও একই ধরনের গোঁজামিল ও অযৌক্তিকভাবে অনড় অবস্থান নিয়ে অনুমোদন দেয় সরকার।

Disconnect