ফনেটিক ইউনিজয়
স্বাগত রমজানুল মোবারক
লিয়াকত আলী

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অমিয় বারতা নিয়ে আবারও শুভাগমন করছে মাহে রমজানুল মোবারক। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতদের দেহ-মন পরিশুদ্ধি ও ফেরেশতাসুলভ বৈশিষ্ট্য অর্জনের সহায়ক হিসেবে এক মাস সিয়াম পালনের বিধান দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর সিয়ামকে ফরজ করা হয়েছেÑ যেমন তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগে যারা ছিল তাদের ওপর, এই আশায় যে তোমরা মুত্তাকি হবে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের সিয়াম পালনকে ইসলামের পাঁচ বুনিয়াদের অন্যতম বলে সাব্যস্ত করেছেন এবং এ ইবাদতের অশেষ পুরস্কারের কথাও ঘোষণা করেছেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত অছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেক সৎকাজেরই পুরস্কার ১০ থেকে ৭০০ গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। তবে সিয়ামের ব্যাপার ভিন্ন। কেননা তা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব।’
‘সিয়াম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘সংযমী হওয়া’। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে পানাহার ও কামাচার থেকে সংযম পালন ইসলামী শরিয়তে ‘সিয়াম’ হিসেবে আখ্যায়িত। নিছক সংযম সাধনা ও কৃচ্ছ্র পালনকে শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘সিয়াম’ হিসেবে সাব্যস্ত হয় না। প্রথমত, নিয়ত শর্ত। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালনার্থে পানাহার ও কামাচার থেকে নিবৃত্ত থাকার ইচ্ছা পোষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেয়াদ রক্ষা করা শর্ত। অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ দীর্ঘ সময় নিরবচ্ছিন্ন সংযমকে সিয়াম বলা হয়। কেউ যদি সুবহে সাদিকের পরও কিছুক্ষণ হলেও পানাহারে লিপ্ত থাকেন, কিংবা সারাদিন অভুক্ত থেকেও সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ আগেই সামান্য পানাহার করে বসেন, তাহলে তার এ দীর্ঘক্ষণ সংযমকে সিয়াম নামে আখ্যায়িত করা যাবে না।
শরিয়তের ইবাদতগুলোর ক্ষেত্রে সীমারেখা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলসেমিবশত শৈথিল্য যেমন নিন্দনীয়, তেমনি আগ্রহের আতিশয্যের মাত্রা অতিক্রম করাও নিষিদ্ধ। এজন্য ইফতারের সময় হয়ে গেলে বিলম্ব না করেই পানাহারের প্রতি মনোযোগী হওয়াই আল্লাহ রাসূলের আদর্শ।
সিয়াম পালনের ফলে বান্দার মধ্যে ‘তাকওয়া’ অর্জন হয় বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে। কুরআন মজিদের সূরা হুজুরাতের ১৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মানুষেরা, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন নর ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের জাতি ও গোষ্ঠীসমূহে বিভক্ত করেছি এজন্য যে, তোমরা পরস্পরে পরিচিত হবে। নিশ্চয়ই তোমাদের সবচেয়ে মুত্তাকিই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত।’
এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদার মাপকাঠি তার ‘তাকওয়া’। যার চরিত্রে তাকওয়ার মাত্রা যেমন, আল্লাহ তাআলার কাছে তার মর্যাদা তেমন। অতএব একজন মুমিন বান্দার উচিত আল্লাহর নিকট মর্যাদা লাভের জন্য তাকওয়ার গুণ অর্জন ও তা উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
‘তাকওয়া’ শব্দের অর্থ সাবধানতা ও সংযম। মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকাই তাকওয়ার অর্থ বলে বর্ণনা করা হয়। তবে মন্দ কাজ বর্জন যেমন জরুরি, তেমনি ভালো কাজগুলো করাও তাকওয়ার অন্তর্গত। কর্তব্য পালন ও বর্জনীয় পরিহারের সমষ্টিই তাকওয়া।
সাধারণভাবে তাকওয়া শব্দের অর্থ করা হয় আল্লাহর ভয়। মহান রাব্বুল আলামিনের সামনে একদিন সবাইকে হাজির হতে হবে। সেদিন জীবনের প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণের হিসাব দিতে হবে। এ বিশ্বাস ও ভয়ই মানুষকে সাবধানী ও সংযমী করে তোলে।
ইসলামী শরিয়তে বান্দার করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তেমনি এসবের গুরুত্ব ও মাত্রার পর্যায়ক্রম নির্ণীত আছে। করণীয়গুলোকে আবশ্যিকতার মাত্রার পর্যায়ভেদ অনুযায়ী ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব পরিভাষায় প্রকাশ করা হয়। আর বর্জনীয়গুলোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় হারাম, মাকরুহ তাহরিমি, মাকরুহ তানজিহি ইত্যাদি পরিভাষা। কর্তব্য পালন ও বর্জনীয় পরিহারের মাত্রা অনুযায়ী তাকওয়ার স্তর বিন্যস্ত করা হয়। মুসলিম মনীষীরা তাকওয়ার তিনটি স্তর বর্ণনা করেনÑ প্রাথমিক, মধ্যম ও উচ্চ। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য যা অবশ্য পালনীয় অর্থাৎ ফরজ ও ওয়াজিব, তা পালন করা এবং যা অবশ্য বর্জনীয় অর্থাৎ হারাম ও মাকরুহ তাহরিমি, তা বর্জন করা তাকওয়ার প্রাথমিক পর্যায়। কারও মধ্যে কমপক্ষে এতটুকু থাকলেও তিনি মুত্তাকি। বলা যায়, একজন মুমিনের জন্য তাকওয়ার এ স্তরটি আবশ্যিক। এ তাকওয়া নাজাতের জন্যও শর্ত।
ফরজ ও ওয়াজিবের পাশাপাশি সুন্নতসমূহ পালন এবং হারাম ও মাকরুহ তাহরিমির পাশাপাশি মাকরুহ তানজিহি বর্জন করা তাকওয়ার মধ্যম স্তর। আর মুস্তাহাবগলোও পালনে এবং সন্দেহজনক কাজসমূহও বর্জনে সচেষ্ট থাকা তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর। পবিত্র মাহে রমজানে সিয়াম আদায়ের পাশাপাশি তাকওয়ার স্তর উন্নত করতে সচেষ্ট থাকাও প্রয়োজন।
সিয়াম আদায়ের ফলে মুমিন বান্দাদের মধ্যে যেমন তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি হয়, তেমনি মানবসমাজে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সৃষ্টিতে এ ইবাদতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি আনুগত্যের পাশাপাশি অনুরাগ ও প্রেমের প্রমাণ দিতে হয় মুমিন বান্দাদের। কালেমায়ে শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে আদম সন্তানরা মহান স্রষ্টার প্রতি নিজের আনুগত্যের অঙ্গীকার ঘোষণা করে। আল্লাহ তাআলার বিধান ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ মেনে নেয়ার ও অনুসরণ করার শপথ নেয়াই কালেমায়ে তৈয়্যেবা ও কালেমায়ে শাহাদাতের মূল তাৎপর্য। সালাতে প্রকাশ্যভাবে, জাকাতে আর্থিকভাবে ও সিয়ামে সংযম পালনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দেয়া হয়। স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যের প্রধান বাধা অহঙ্কার, যা দমন হয় সিয়াম পালনের মাধ্যমে। আল্লাহর নির্দেশ পালনে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয় সিয়ামের মধ্য দিয়ে। তাছাড়া একজন মুসলমানের ওপর যেমন কিছু করণীয়, তেমনি কিছু বর্জনীয় কর্তব্য আরোপিত হয়। বর্জনীয় কর্তব্যগুলোর প্রথমেই আসে নির্দিষ্ট সময়সীমায় পানাহার বর্জনের বিষয় যা সিয়াম নামে অভিহিত। আর মুসলমানদের পারস্পরিক সমবেদনা ও সহানুভূতির চেতনা জাগ্রত হয় সিয়ামের কারণে।

Disconnect