ফনেটিক ইউনিজয়
শ্রমমজুরির হালচাল : পর্ব ৩
বেতন বাড়লেও সচ্ছলতা রয়ে যায় অধরা
ইমদাদ হক

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি মোটাদাগে দেশের পোশাক কারখানার নিরাপত্তাহীনতার ছবিটাই তুলে ধরে। এরপর কারখানা সংস্কারে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। সাফল্যও আসছে মোটাদাগে। তবে কারখানার উন্নত পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ শ্রম দেয়ার মতো শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের পদক্ষেপ রয়ে গেছে অধরাই। অথচ ৩০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি বাণিজ্য তিলে তিলে গড়ে উঠেছে শ্রমিকশ্রেণির নিরন্তর ঘামেই। পোশাক কারখানার উৎপাদন আর শ্রম সক্ষমতার সর্বশেষ হালহকিকত অনুসন্ধান করার চেষ্টা হবে এ সিরিজ লেখায়

রাজধানীর কল্যাণপুর নতুন বাজারের কাঁচাবাজারের ব্যাগ হাতে ঘুরছেন আমিনা খাতুন। এ দোকান থেকে ওই দোকানে যাচ্ছেন, দেখছেন চাহিদামতো সবজিসহ নিত্যপণ্যগুলো। আধাঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি সবজির বাজারেই চক্কর দিচ্ছেন, কিনতে পারছেন না পছন্দের কোনো কাঁচাপণ্য। কারণ সবজির বাজারের প্রতিটি পণ্যের দামই চড়া। পছন্দ হয় তো দামে হয় না, দামে হলে আবার পণ্যের মান খারাপ। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের কেজিতে দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা। যেখানে কেজিতে বাড়তি ১০-১৫ টাকা গুনতে হচ্ছে রসুনে। দাম বাড়ার এ সূচক আলু, পটল, বেগুনসহ বেশিরভাগ নিত্যপণ্যেই। সেখানে গার্মেন্টকর্মী আমেনার মতো নিম্ন আয়ের মানুষের কেনাকাটা অনেকটাই দুরূহ হয়ে উঠছে।
আমিনার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। জানান, কল্যাণপুরের স্কাই ফ্যাশনস গার্মেন্টসে কাজ করেন তিন বছর ধরে। শুরুতে বেতন ছিল ৩ হাজার টাকা। সঙ্গে ওভারটাইম দিয়ে ৪ হাজার টাকার মতো পেতেন। বছরখানেক পর বেতন বেড়ে হয় ৫ হাজার ৩০০ টাকা। সর্বশেষ গত বছর বেতনের সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়েছে আরও কয়েকশ টাকা। বছরে দুই ঈদে বোনাস পান। বাকিটা সময় নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বাড়া বা অন্য খাতে ব্যয় বাড়লেও এ সীমিত আয় দিয়েই সারতে হয় চার সদস্যের সংসারের রোজকার গল্প। আমিনার সঙ্গে থাকা আরেক পোশাককর্মী রাবেয়া আক্তার জানান, আগে রুম ভাড়া ছিল ১ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার টাকা। বাড়ির মালিক এ বছর নাকি আবার বাসাভাড়া বাড়াবেন? শিশুদের স্কুলের খরচও আগের চেয়ে বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা। এর মধ্যে মূল মজুরি ৩ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা এবং চিকিৎসা, যাতায়াত ও খাদ্য ভাতা ১ হাজার ১০০ টাকা। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এ মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়। তার আগে পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ছিল ৩ হাজার টাকা। একেকটি মজুরি কাঠামো পাঁচ বছরের জন্য ঘোষণা করা হয়। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্যমতে, এ খাতে বর্তমানে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যার বেশিরভাগই নারী। অথচ নিয়ম করেই দাম বেড়ে চলেছে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের। সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা ও আবাসন ব্যয়ও রয়েছে। এত কম বেতন দিয়ে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জীবননির্বাহ কেবল কঠিনই নয়, অনেকটাই অমানবিক। যদিও পোশাক মালিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আগের চেয়ে সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। বেতনের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মালিকরা শ্রমিকদের অক্লান্ত শ্রম সম্পর্কে অবগত। কাজের শুরুতেই তারা একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর বেতন পাচ্ছেন। প্রতিবছর তাতে যোগ হচ্ছে ইনক্রিমেন্ট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের চিকিৎসা সহায়তাও দেয়া হচ্ছে। নতুন মজুরি কাঠামোর কাজ চলছে, যা হলে তাদের বেতন-ভাতা বাড়বে। বর্তমান বাজার মূল্যের সঙ্গে তাদের আয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিয়ালের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) মহাসচিব তৌহিদুর রহমান বলেন, চালের মূল্যবৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত বাড়িভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির কারণে পোশাক খাতের প্রায় অর্ধকোটি শ্রমিকের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, দেশের ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই যদি হয়, তবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে বঞ্চিত করে এ ধরনের উন্নয়ন টেকসই হবে না। তিনি দাবি করেন, মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে সব শ্রমিক সংগঠনই একমত। এ ব্যাপারে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে কালক্ষেপণ করা উচিত হবে না।
তবে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়েও রয়েছে ধূম্রজাল। শুরুতেই একজন শ্রমিককে মজুরি কাঠামোর নিম্নস্তরের এ বেতন দেয়া হয় না। এক বছর, দুই বছর বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় পর তাকে মজুরি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা হয়, যা একধরনের প্রতারণাই বলছেন শ্রমিক নেতারা। তবে বিষয়টিকে দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করছেন পোশাক মালিকরা।
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, পোশাক শ্রমিকদের মজুরির ক্ষেত্রে মালিকদের পক্ষ থেকে নানা টালবাহানা করা হয়। অথচ এ শ্রমিকের ঘামেই গড়ে উঠছে মালিকের বিত্ত, এগোচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তাই কাজের শুরুতেই শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো অনুসরণ করে বেতন-ভাতার দাবি জানাচ্ছি। একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন নিয়েই প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। প্রতিবার ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে সরকারদলীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মনোনীত করা হয়। তারা কখনই শ্রমিকস্বার্থের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না। ফলে মালিকপক্ষের চরম আধিপত্যই মজুরি বোর্ডের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য।
বিজিএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ নাসির বলেন, শ্রমিকদের বেতনের ক্ষেত্রে দক্ষতা একটি অপরিহার্য বিষয়। যথাযথ প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বা কাজের কারিগরি জ্ঞান বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের এগিয়ে রাখবে স্বাভাবিকভাবেই। তবে বেশিরভাগ কারখানাতেই মজুরি কাঠামো পুরো অনুসরণ করা হয় বলেও দাবি তার।
২০১৩ সালের নভেম্বরে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার পর তা বাস্তবায়ন হয় পরের বছরের জানুয়ারিতে। সে অনুযায়ী এন্ট্রি লেভেলে একজন শ্রমিক নিম্নতম ৫ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন। ষষ্ঠ গ্রেডে ৫ হাজার ৬৭৮ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৬ হাজার ৪২, চতুর্থ গ্রেডে ৬ হাজার ৪২০, তৃতীয় গ্রেডে ৬ হাজার ৮০৫, দ্বিতীয় গ্রেডে ১০ হাজার ৯০০ ও প্রথম গ্রেডে ১৩ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত আছে। এছাড়া বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেয়া বাধ্যতামূলক। শ্রম আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর পরপর নিম্নতম মজুরি পর্যালোচনা করা যায়। এছাড়া বিশেষ পারিপার্শ্বিক অবস্থায় যেকোনো পর্যায়ে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে নিম্নতম মজুরি ঘোষণার নিয়ম আছে।

Disconnect