ফনেটিক ইউনিজয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার্থীদের ভিন্নরূপের সেহরি-ইফতার
সরদার মারুফ

শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। সে কারণে রমজানের ছুটিতেও ক্যাম্পাসে থাকতে হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের। সেহরি বা ইফতারের সময়ে পরিবারের সঙ্গেই থাকতে চায় সবাই। অথচ শিক্ষার্থীদের একরকম বাধ্য হয়েই ক্যাম্পাসে করতে হচ্ছে সেহরি ও ইফতার। সেহরি-ইফতারে অনেকটা ভিন্নরূপ দেখা যায় এখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা বন্ধু, বড় ভাই ও ছোট ভাইদের নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে সেহরি ও ইফতার করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেহরি ও ইফতার মানেই আলাদা অভিজ্ঞতা। শেষ রাতে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে সেহরি খাওয়ার মাঝে থাকে যেন অন্যরকম রোমাঞ্চ। ক্যাম্পাসে সবুজ ঘাসের ওপর পত্রিকা বিছিয়ে সহপাঠী বা বন্ধুদের নিয়ে ইফতার করলে সব ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই দূর হয়ে যায়! সেহরিতে যেভাবে একসঙ্গে সবাইকে খেতে দেখা যায়, ইফতারে ঠিক তার উল্টোটা চোখে পড়ে। কেউ রুমমেটদের সঙ্গে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ ছোট অথবা বড় ভাইদের নিয়ে ইফতার করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী মাজহারুল ইসলাম রবিন বলেন, ‘সাধারণত হলেই সেহরি ও ইফতার করা হয়। একা একা খেতে ভালো লাগে না। এ কারণে যেখানেই থাকি না কেন ইফতার বা সেহরি সবসময় বন্ধু বা রুমমেটদের সাথে খাওয়ার চেষ্টা করি। তাদের সাথে ইফতার বা সেহরি করলে মনের ভেতরে একটা আনন্দ কাজ করে। মনে হয় নিজের পরিবারের সাথেই আছি। অবশ্য মনে হওয়া বলাটা ভুল হবে। তারাও তো একটা পরিবারের মতোই।’
রাতে হলের ডাইনিংয়ে সেহরি করতে হলে ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠতে হয়। একটু দেরি হলেই আর খাবার পাওয়া যায় না। পরে চিড়া বা অন্য কিছু খেয়ে রোজা রাখতে হয়। নতুবা না খেয়েই থাকতে হয়। সেহরিতে হলের ডাইনিং বা ক্যান্টিনে ভাতের সাথে পাওয়া যায় সবজি, গরুর মাংস, খাসির মাংস, মুরগির মাংস এবং বিভিন্ন রকমের মাছ। এদিকে মেয়েদের হলের চিত্রটা ছেলেদের হল থেকে কিছুটা ভিন্ন। কেননা তারা রান্না করে খেতেই বেশি পছন্দ করেন। তবে রান্না করতে চাইলেও সবাই হলে রান্না করার সুযোগ পান না।
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী টিপু সুলতান বলেন, ‘হলের ডাইনিংয়ে সেহরি করার জন্য রাত সোয়া ৩টার দিকে উঠে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবারের টোকেন নিতে হয়। এর একটু পরে গেলে আর টেবিলে সিট পাওয়া যায় না। দাঁড়িয়েই সেহরি করতে হয়। আর ঘুম থেকে ৩টার পর উঠলে তো কথাই নেই। নির্ঘাত না খেয়েই রোজা রাখতে হবে।’
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তেই শিক্ষার্থীরা নিতে শুরু করেন ইফতারের প্রস্তুতি। সবাই মিলে টাকা তুলে কী কী আইটেম দিয়ে ইফতার করবেন, সে পরিকল্পনা চলে অনেকক্ষণ। কে কী কাজ করবেন, তাও ভাগ করে নেন সবাই। এরপর হলের ক্যান্টিনসহ আশপাশের দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয় ইফতারসামগ্রী।
হলগুলোয় ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি হলে সাত-আটটি দোকানে ইফতার পণ্য সাজিয়ে রাখা। এর মধ্যে রয়েছেÑ ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, জিলাপি। এছাড়া মৌসুমি ফল আম, লিচু, আনারস, কলা, খেজুর রয়েছে ইফতারির দোকানে। শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমতো কিনছেন। ছেলেদের হলে শসা, পেঁয়াজ, ধনিয়া পাতা, কাঁচা মারিচ সব কেটে প্যাকেট করেও রেখেছেন বিক্রেতারা।
ক্যাম্পাসে সম্পর্ক দৃঢ় করতে অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও এলাকাভিত্তিক সংগঠন ইফতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এসব সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীরা সেসব অনুষ্ঠানেও যোগ দেন। জেলাভিত্তিক বেশিরভাগ ইফতার আয়োজন হয় টিএসসিতে। এছাড়াও অপরাজেয় বাংলার বটতলা, লাইব্রেরি চত্বর, ডাকসু ক্যাফেটারিয়া, কার্জন হলসহ বিভিন্ন স্থানে বসে ইফতারের মেলা। ইফতার পার্টিতে সিনিয়র-জুনিয়র সবাই একত্রিত হন। বৃদ্ধি পায় সৌহার্দ্য। ভাগাভাগি হয় সুখ-দুঃখের হাজারো কথা। সুযোগ থাকে নেতৃত্ব বিকশিত করার।
সিলেট অঞ্চলের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কাজী সাজিম আহমেদ বলেন, ‘রমজানে এলাকার সব ভাই-বেরাদরদের সাথে ইফতার করার মজাই আলাদা। সবার সাথে সম্পর্ক এতে আরও দৃঢ় হয়। তাছাড়া এর সাথে মানসিক প্রশান্তি তো আছেই।’
ক্যাম্পাসে ইফতারের একটা বিশেষ দিক হলো প্রতিদিনের আয়োজনের বাইরেও মাঝে মধ্যে থাকে একটু ঘটা করে ‘ইফতার পার্টি’র আয়োজন। আর এ ইফতার আয়োজনগুলো শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে বিশাল ‘গেট টুগেদার’। ক্যাম্পাসে বহুদিনের আড্ডার বড় ভাই-বোনেরাও চলে আসেন ফেলে যাওয়া দিনগুলো ফিরে পাওয়ার জন্য।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগও একই রকম আয়োজন করে। বিভিন্ন হলে বিভাগভিত্তিক ইফতারের আয়োজন যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র ইমরান হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন হলে বিভাগভিত্তিক ইফতার আমি বেশ উপভোগ করি। একেক দিন একেক হলে একেক দলের সঙ্গে ইফতার করা হয়। এতে সবার সাথে পরিচিতি বাড়ে এবং নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় হয়।’
তবে এত কিছুর পরও শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ইফতারের জন্য যেসব দোকান পসরা সাজিয়ে বসে, সেখানে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ইফতার প্রস্তুত করা হয় না। পুরনো তেল দিয়ে, খোলা হাতে ইফতারসামগ্রী তৈরি হয়। এতে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এছাড়া সেহরিতে যেসব খাবার পরিবেশন করা হয়, তাও স্বাস্থ্যকর নয়। যেসব মাছ বা মাংস দেয়া হয়, তাতে কোনো না কোনো সমস্যা থাকে। অনেক সময় নষ্ট খাবারও পাওয়া যায়, যেগুলো একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী।
এ বিষয়ে আরবি বিভাগের ছাত্র আরিফুল হক বলেন, ‘হলে আমরা সেহরি ও ইফতারের জন্য যে খাবার খেয়ে থাকি, তা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু কী আর করা। বাঁচার জন্য বাধ্য হয়ে খেতেই হয়। মনে হয় আমরা হলের শিক্ষার্থীরা খাওয়ার জন্য বাঁচি না, বাঁচার জন্যই খাই।’
বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘হলের ক্যান্টিনে খাবারের মান ঠিক রাখার জন্য আমরা ক্যান্টিন ম্যানেজারকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে বলি। আমরা সবসময় চাই হলের ছাত্ররা যাতে ক্যান্টিন থেকে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পারে। এর জন্য যেকোনো পদক্ষেপ আমরা নিতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, “ক্যান্টিন থেকে সেহরি ও ইফতারির জন্য যে খাবার তৈরি হয়, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই হল প্রশাসন থেকে ক্যান্টিন ম্যানেজারকে ‘কেন তার সাথে চুক্তি বাতিল করা হবে না’ এ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়েছে। এর আগেও খাবারের মান ঠিক রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় আরেক ম্যানেজারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছিল।”
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে প্রশাসন থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য একদিন উন্নতমানের ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। এ বিষয়ে মাস্টারদা সূর্য সেন হলের সিনিয়র আবাসিক শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানের মতো। আমরা শিক্ষকরা একদিন ছাত্রদের নিয়ে একসাথে ইফতার করি। হলে যত ছাত্র আছে আবাসিক-অনাবাসিক সবাই এতে অংশ নেয়। একসাথে ইফতার করার মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে।’

Disconnect