ফনেটিক ইউনিজয়
বি শে ষ সা ক্ষা ৎ কা র
‘একটি সুন্দর ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য’

প্রফেসর ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহ্, দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও মৎস্যবিজ্ঞানী। ২০০৮-১২ সাল পর্যন্ত তিনি সফলতার সাথে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের (ভিসি) দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্তমানে ফেনী ইউনিভার্সিটির ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহাদাত হোসেন তৌহিদ

সাম্প্রতিক দেশকাল : বর্তমানে বাংলাদেশে নানামুখী শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আপনার মতামত?
সাইফুদ্দিন শাহ্ :
আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিরিখে শিক্ষার নানামুখিতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। মানবিক, সামাজিক, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রকৌশলÑ সব বিষয়ে শিক্ষায় আমাদের জাতিকে সমানভাবে এগিয়ে যেতে হবে এবং তা শিক্ষার সার্বিক মানের বিষয়ে কোনো প্রকারের আপস না করেই হতে হবে। শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যে বিতর্ক, তার যথেষ্ট যুক্তি আছে। বর্তমানে শিক্ষার নামে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ^বিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত যা চলছে, তাকে একটি নৈরাজ্য ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। দেশে শিক্ষার মানের যে সার্বিক বিপর্যয় ঘটেছে, তার কারণ হিসেবে কেবল পরিকল্পনাহীন শিক্ষাব্যবস্থাকেই দায়ী করা যায়।

সাম্প্রতিক দেশকাল : আজকাল লেখাপড়ার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্যারিয়ার গড়া। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
সাইফুদ্দিন শাহ্ :
শিক্ষার উদ্দেশ্য ক্যারিয়ার গঠন- এ কথা বলা যায় না। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে একজন মানুষ হতে না পারলে শুধু ক্যারিয়ার গঠনে শিক্ষার উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। তাই কোনো বিশেষ বিষয়ে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পাশাপাশি জীবনকে, সমাজকে এবং সমাজের মানুষদের চেনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। মানুষ ও সমাজকে চিনতে না পারলে নিজেকে চেনা যায় না; আর যে নিজেকে চিনতে পারে না, সে দেশকে কী দেবে আর দেশের মানুষকেই বা কী দেবে? তাই সেরকম ক্যারিয়ারসম্পন্ন মানুষের দ্বারা দেশের ও সমাজের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় না। একটি সুন্দর ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য।

সাম্প্রতিক দেশকাল : বর্তমানে ফেনীতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও শিক্ষার্থীদের সাথে ফেনী ইউনিভার্সিটি মতবিনিময় করেছে, বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন কি?
সাইফুদ্দিন শাহ্ :
ফেনী একটি ছোট জেলা। ফেনী ইউনিভার্সিটির কর্মকা-ও তাই ছোট। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এ ইউনিভার্সিটিতে ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখা করতে আসবে, তা সহজে আশা করা যায় না, বরং ফেনীতেই যারা আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল তারা ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংকট থাকাটাই স্বাভাবিক। এ বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু সম্ভাব্য ছাত্র-ছাত্রী এ অঞ্চলের কলেজগুলো থেকেই আসে। উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পরপরই আমি চেয়েছি ফেনী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রত্যেকটি কলেজের অধ্যক্ষদের সাথে মতবিনিময় করতে, তাদের সহযোগিতা চাইতে, যাতে তারা তাদের কলেজ থেকে পাস করা ছাত্র-ছাত্রীদের এ বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। মতবিনিময়ের পর এ বছরের শুরু থেকেই ফেনী অঞ্চলের বিভিন্ন কলেজে একটি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে ফেনী ইউনিভার্সিটির ভূমিকার ওপর অনেকগুলো সেমিনার অনুষ্ঠান করেছি। উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক প্রেক্ষিতটি এরকম যে, কোনো দেশের উন্নয়ন দেশের সর্বত্র সমানভাবে এগোয় না। দেশের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোয় উন্নয়নের বার্তা নানা কারণে সহজে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, ফলেই সেসব অঞ্চল উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে পিছিয়ে পড়ে। উন্নয়ন, আঞ্চলিকতা ও উচ্চশিক্ষা- বিষয়গুলো আলোচনায় নিলে এ কথা সহজেই অনুমান করা যায় যে, ফেনীতে এ উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ স্থাপন অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য হয়েছে। আমাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে ফেনী ইউনিভার্সিটি বিশেষ প্রচারণা পেয়েছে। ফলে এবারের স্প্রিং সেমিস্টারে এ ইউনিভার্সিটিতে এ-যাবৎকালের রেকর্ডসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছে।

সাম্প্রতিক দেশকাল : সংস্কৃতি কী? একটি জাতির জন্য সংস্কৃতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সাইফুদ্দিন শাহ্ :
সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আচার, রীতি-নীতি, শিল্পকলা। জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার মিথস্ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট রীতি-নীতি ও আচারাদিই হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি একটি জাতির প্রাণশক্তি। যে জাতির সংস্কৃতি যত সমৃদ্ধ, সে জাতি তত সমৃদ্ধ। একটি জাতির অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যের সাথে তার সংস্কৃতির বিকাশ গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

সাম্প্রতিক দেশকাল : আমাদের আর্থসামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূল সংকট কোথায়?
সাইফুদ্দিন শাহ্ :
মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা একটি জাতি বা রাষ্ট্রের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি রাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থার সাথে যারা জড়িত থাকেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সে দেশের সার্বিক আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য যদি নিয়োজিত না থাকে, তবে সে রাষ্ট্র উন্নতি লাভ করতে পারে না। এ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়োজিত থাকার অর্থই হলো দেশের মানুষের সাথে সংযোগ থাকা এবং তখনই কেবল রাষ্ট্রের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের কল্যাণ প্রতিফলিত হতে পারে।

সাম্প্রতিক দেশকাল : সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ কী? কিংবা পুঁজিবাদকে কীভাবে দেখেন?
সাইফুদ্দিন শাহ্ :
সাম্রাজ্যবাদ বলতে সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র দ্বারা দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্বস্থাপন ও নিয়ন্ত্রণকে বোঝায়। দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর শক্তিশালী রাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার ও হস্তক্ষেপ। লেনিনের মতে, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর হলো সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদীদের সৃষ্টি। যে উৎপাদনব্যবস্থায় সব উৎপাদন যন্ত্র ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকে এবং উৎপাদন পদ্ধতিতে অবাধ মুনাফা অর্জনের সুযোগ প্রতিষ্ঠিত, তাকে পুঁজিবাদ বলে। একসময় সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রত্যক্ষভাবে পেশিশক্তির মাধ্যমে মানুষকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের কথা শুনতে বাধ্য করা হতো। তখন সাম্রাজ্যবাদ সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করতে পারত। কিন্তু এখন সামরিক শক্তিকে কম ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি দ্বারা সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিষ্ঠা ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এখন একে দেখা যায় না, তাই চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে প্রয়োজনে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করা হয়। অর্থনৈতিক কারণটাই সাম্রাজ্যবাদের পেছনে প্রধান। সভ্যতার বিকাশের নামে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে। যেমন ব্রিটেন সভ্যতার বিকাশের নামে পৃৃথিবীর নানা অঞ্চলে সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল। বিশ্বনিরাপত্তার নামেও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকে যা করছে। উৎপাদিত পণ্যের বাজার তৈরি করার জন্যও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাজনৈতিক আধিপত্য বৃদ্ধির জন্যও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইউক্রেন আমেরিকা ও রাশিয়ার রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের শিকার।

Disconnect