ফনেটিক ইউনিজয়
মর্যাদার রজনী ‘লাইলাতুল কদর’
লিয়াকত আলী

মাহে রমজানুল মোবারকের ২৬ তারিখ দিবাগত রাত বা রমজানের ২৭তম রাত সাধারণভাবে ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘কদরের রাত’ হিসেবে পরিচিত। আভিধানিকভাবে ‘লাইলাতুল কদর’ অর্থ সম্মানের রাত। অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি রাত এ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। কুরআন মজিদে ‘আল কদর’ নামে একটি সূরা নাজিল হয়েছে এ প্রসঙ্গে।
ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) নাজিল করেছি কদরের রাতে। আপনি জানেন, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাকুল ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’ (আয়াত ১-৫)
তাফসিরের কিতাবগুলোতে বর্ণিত আছে, আগের যুগের উম্মতেরা দীর্ঘ হায়াত পেতেন এবং দীর্ঘকাল ইবাদত বন্দেগি করতে পারতেন বলে বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ বর্ণনা শুনে সাহাবায়ে কেরাম হতাশ হন যে, আমরা স্বল্প আয়ুর কারণে আগের উম্মতের মতো মর্যাদা ও সম্মান লাভের যোগ্যতা অর্জন করতে পারব না। তাই আল্লাহতাআলা কুরআন মজিদের এ সূূরাটি নাজিল করে জানিয়ে দিলেন যে, উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য এক রাতের ইবাদতের বিনিময়ে হাজার মাস বা ৮৩ বছর চার মাসের চেয়েও বেশি সময় ধরে ইবাদতের সওয়াব লাভের সুযোগ রয়েছে।
আল্লাহতাআলা এ রাতেই কুরআন মজিদ নাজিল করেছেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তেমনি এ রাতটির মর্যাদা হাজার মাসের চেয়ে বেশি বলেও ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এটি কোন রাত, তা নির্দিষ্ট করে দেননি। হাদিস শরিফেও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি কোনটি কদরের রাত। নিঃসন্দেহে এতে অনেক রহস্য ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু    আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছেন। ইবাদত বন্দেগির মধ্য দিয়ে রাতটি কাটাতে পারলে প্রকৃত সুফল পাওয়া যায়।
হয়তো আল্লাহতাআলা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাননি মুসলমানরা একটি রাতের ভরসায় বসে থেকে সারা বছর বা সারা মাস অবহেলায় কাটিয়ে দিক। এজন্য এটাকে রহস্যময় করে রাখা হয়েছে। তাছাড়া পরিশ্রম ও সাধনার মাধ্যমেই মূল্যবান কিছু অর্জন করতে হয়। যে রাতের মূল্য হাজার মাসের চেয়ে বেশি, তা যদি সহজে পাওয়া যেত, তাহলে মানুষ হয়তো এটাকে বেশি গুরুত্ব দিত না। তাই তা অনির্দিষ্ট করে রেখে মানুষকে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে।
কেউ কেউ রমজানের যেকোনো অংশে এ রাত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু অধিকাংশ মণীষীর মতে, রমজানের শেষে দশকেই তা লুক্কায়িত রয়েছে। আবার কারও কারও মতে, এ রাতের তারিখ পরিবর্তনশীল। কোনো বছর ২১, কোনো বছর ২৭, আবার কোনো বছর ২৯ তারিখের রাত লাইলাতুল কদর হয়। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে অনেক মনীষী রমজানের ২৭ তারিখের রাতকে লাইলাতুল কদর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ব্যাপারে সাহাবিদের মধ্যে হজরত উবাই ইবনে কাব রাজিয়াল্লাহু আনহুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, রমজানের ২৭তম রাতই কদরের রাত। অন্যদিকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, এটা রমজানের বাইরেও হতে পারে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহুর মন্তব্য সম্পর্কে হজরত উবাই ইবনে কাব রাজিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘আমার ভাই আবদুল্লাহ ভালো করেই জানেন, এটা রমজানের মধ্যে এবং তা ২৭তম রাত, কিন্তু লোকেরা এ রাতের ভরসায় বসে থাকবে এবং আলসেমিতে সারা বছর ও সারা রমজান মাস কাটিয়ে দেবে- এ ভয়ে তিনি তা লোকদের জানাতে চান না।’ হজরত উবাই ইবনে কাব রাজিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন, ২৭ রমজানের রাতটিই কদরের রাত?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘এ রাতের যেসব আলামত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বলেছেন, আমরা সেগুলো ২৭ তারিখে পেয়েছি।’ হজরত ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি অলাইহি এবং হজরত আবদুল কাদের জিলানি রহমাতুল্লাহি অলাইহিসহ এক দল মনীষীর ব্যাপারে বলা হয়, তারা রমজানের ২৭ তারিখের রাতকে লাইলাতুল কদর বলে মনে করতেন। এসব মনীষীর নাম যুক্ত হওয়ার ফলে রমজানের ২৬ তরিখ দিবাগত রাতটি অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করার ধারা চালু হয়েছে।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কদরের রাতের যে মর্যাদা বৈশিষ্ট্য, তার মূল উৎস কুরআন মজিদ। শেষ নবীর উম্মতের জন্য জীবন ব্যবস্থার চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে কুরআন মজিদ নাজিলের সাথে রাতটি সম্পর্কিত হওয়ায় এ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত হয়েছে। অতএব এ রাতের সুফল পুরোমাত্রায় পাওয়ার জন্য কুরআন মজিদের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করাই আসল উপায়। কুরআন পাঠ ও অধ্যয়ন এবং কুরআনি বিধান ও নির্দেশনা অনুসরণেই নিহিত রয়েছে মানুষের প্রকৃত সাফল্য। আল্লাহর রাসুলের যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সময়ে কুরআন মজিদের বিধান অনুসরণের ফলেই গড়ে উঠেছিল এমন এক জনগোষ্ঠী, যারা বিশ্বমানবতার সামনে ছিলেন অনন্য আদর্শ। মুসলিম উম্মাহ প্রায় হাজার বছর ধরে বিশ্বের নেতৃত্ব দিয়েছিল। শিক্ষা, বিজ্ঞান, দর্শন ও ভাবধারায় সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। অথচ এখন মুসলিম উম্মাহ সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে। এটা শুধু কুরআন মজিদের বিধান ও নির্দেশনা থেকে সরে আসার কারণেই। মুসলমানদের যদি নিজেদের হারানো গৌরব উদ্ধার করতে হয়, অবস্থার পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে কুরআনের কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। লাইলাতুল কদরে সালাত, তেলাওয়াত ও জিকির তাসবিহের সাথে যেমন অতীত জীবনের পাপরাশি মোচনের জন্য মহান প্রভুর কাছে আকুল আবেদন জানাতে হবে , তেমনি তাঁর তাওফিক প্রার্থনা করতে হবে কুরআনকে জীবনের দিশারী হিসেবে মেনে চলার।

Disconnect