ফনেটিক ইউনিজয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার
নানা সংকটে বাধাগ্রস্ত শিক্ষার পরিবেশ
সরদার মারুফ
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে ঢোকার প্রতীক্ষায় দীর্ঘ লাইনে শিক্ষার্থীরা
----

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে এক সুদীর্ঘ, সুবিশাল আর গৌরবময় ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের এক বিরাট অংশ ধরে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গ্রন্থগার নানা সংকটে জর্জরিত। আসন সংকটের পাশাপাশি রয়েছে সময়োপযোগী বইয়ের অভাব, নতুন জার্নাল প্রকাশ ও বইগুলোর যথোপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। এতে গ্রন্থাগারে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
১৯২১ সালের ১ জুলাই তৎকালীন ঢাকা কলেজের গ্রন্থাগার থেকে পাওয়া ১৭ হাজার বইয়ের সাথে আরও এক হাজার বই যুক্ত করে মোট ১৮ হাজার বই নিয়ে যাত্রা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বর্তমানে এখানে ৬ লাখ ৮৬ হাজারেরও বেশি বই ও সাময়িকী রয়েছে বলে জানা যায়। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, যুগোপযোগী বই না থাকায় শিক্ষার চাহিদা পরিপূর্ণভাবে মেটাতে পারছে না গ্রন্থাগারটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৮ হাজারেরও অধিক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার জন্য রয়েছে একটি মাত্র গ্রন্থাগার, যার আসনসংখ্যা মাত্র ৬৬০। এ সীমিত আসনের অনেকগুলোই আবার ব্যবহারের অনুপযোগী, যার জন্য প্রতিদিন গ্রন্থাগার খোলার অনেক আগেই শিক্ষার্থীরা নেমে পড়েন সিট দখলের লড়াইয়ে।    
নিজেদের ব্যাগ দিয়ে সিরিয়াল করে লাইন দিয়ে রাখেন। পরীক্ষার সময় চলে এলে এ লাইন অনেক সময় লাইব্রেরির গেট থেকে প্রায় ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। আবার অনেকে এসে তাদের বন্ধুদের জন্য সিট রাখে। ফলে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা অনেক সময় সিট না পেয়ে চলে যায়। এর সাথে রয়েছে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ।
গ্রন্থাগারে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে গত বছরের ২৩ এপ্রিল নতুন ডিজিটাল গেট তৈরি করে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল কার্ডের (আইডি) কুইক রেসপন্স কোড (কিউআর) দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ এবং একই পদ্ধতিতে বের হয়ে আসতে পারেন। তবে তা চালু হলেও কার্যকর নয়।
এদিকে কম্পিউটারের মাধ্যমে বই, কল নম্বর সংগ্রহ করার ব্যবস্থা থাকলেও কল নম্বর অনুযায়ী বই খুব কমই পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য যে কম্পিউটার রয়েছে তার বেশির ভাগই নষ্ট। বারবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও পাওয়া যায় না কোনো সমাধান। গ্রন্থাগারের বাজেট প্রয়োজন অনুযায়ী না বাড়ানোর কারণে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি গ্রন্থাগারের কর্মকর্তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রন্থাগারের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে পারেন। আমরা শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে ফিঙ্গার প্রিন্ট প্রযুক্তি চালু করেছি। এ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শতভাগ বর্তমান শিক্ষার্থীকে গ্রন্থাগার ব্যবহার করার সুযোগ দেয়া হবে।’
গ্রন্থাগারে আসন পাওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের থাকতে হয় দুশ্চিন্তায়। জরুরি প্রয়োজনে আসন থেকে উঠলেই তা দখল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এভাবেই চলতে থাকে পড়ার জন্য তাদের সংগ্রাম। কেউ কেউ এ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেকটা বাধ্য হয়েই গ্রন্থাগার ত্যাগ করে হল অথবা বাসায় চলে যান। তবে গ্রন্থাগারে সবাই যে পড়তে আসেন, তা নয়। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ আবার প্রাইভেট পড়ানোর কাজটাও চালিয়ে নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বসেই। আবার কাউকে আসন দখল করে রাখতে দেখা যায় বন্ধুর জন্যও।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গ্রন্থাগারে আসা অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী নন। অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় পাসের পরও চাকরির পড়াশোনার জন্য ব্যবহার করছেন গ্রন্থাগারটি। পিছিয়ে থাকছেন না বহিরাগতরাও। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। তাই তো ‘গ্রন্থাগারে জায়গা পাওয়া যায় না’- এই সত্যকে নিয়তি ধরেই নিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বেল্লাল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী হিসেবে গ্রন্থাগারে পড়া আমার নায্য অধিকার। কিন্তু অছাত্র ও বহিরাগতদের কারণে সেই ভোরবেলা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে বহু কষ্টে প্রবেশ করতে পারলেও বসার সিট পাওয়া যায় না। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় বই-পুস্তকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এখানকার বেশির ভাগই সেই পুরনো ধারার বই ও সাময়িকী।’
এ ব্যাপারে গ্রন্থাগারিক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. এসএম জাবেদ আহমদ বলেন, ‘আমরা লাইব্রেরির আসন সংখ্যা বাড়াচ্ছি। আরো ৪০০ আসন বসানো হচ্ছে। আর লাইব্রেরিটি ১০ তলা বিল্ডিং হবে।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সেমিনার-লাইব্রেরিতেও একই অবস্থা। আসন সংকটের পাশাপাশি রয়েছে প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী বই-পুস্তক, জার্নালের সংকট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে যেমন আসন সংকট এবং প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী বইয়ের অভাব রয়েছে, তেমনি বিভাগীয় সেমিনারেও একই অবস্থা বিরাজমান। এতে অনেক সময় আমরা প্রয়োজনীয় বই-পুস্তক খুঁজে পাই না।’

বিশিষ্টজনের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশের যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই লাইব্রেরি অবহেলিত থাকে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিও অবহেলিত অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে আমাদের লাইব্রেরিতে পেশাদার লাইব্রেরিয়ান খুব কমই দেখা যায়। আর পেশাদার লাইব্রেরিয়ান না থাকলে লাইব্রেরি গড়ে ওঠে না। শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক স্টাফ ও কর্মচারী পাওয়া যায় না। এখন শোনা যায়, আমাদের এ লাইব্রেরি আগের মতো ব্যবহৃত হয় না। যারা লাইব্রেরিতে পড়তে যায়, তারা সবার আগে আসন দখল করতে যায়। যুগোপযোগী বই-পুস্তকের অভাব তো আছেই। এটি আবার লাইব্রেরিয়ানদের দক্ষতার সাথে জড়িত। লাইব্রেরিয়ানরা যদি সে রকম দক্ষ না হন, তাহলে কোন বিষয়ে কোন বই আনতে হবে, তা জানবে না। সেজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সমস্যা আগেও ছিল, এখনও বিরাজমান। তাই লাইব্রেরিকে সত্যিকার অর্থে গড়ে তুলতে হলে লাইব্রেরিয়ানদের পেশাদারিত্বে ফিরে আসতে হবে এবং লাইব্রেরির পরিসর বাড়াতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘লাইব্রেরিকে নিয়ে আমাদের কিছু পরিকল্পনা আছে। এটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি। পাশাপাশি যুগোপযোগী বই-পুস্তকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও আমাদের আছে।’

Disconnect