ফনেটিক ইউনিজয়
শোষিতের আর্তচিৎকারের প্রতিধ্বনি ডেসটিনির সম্পদে
ইমদাদ হক

বড় ধরনের কোনো পরিশ্রম ছাড়া অল্প দিনেই বড়লোক বানিয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়ে গণপ্রতারণার ফাঁদ পাতে একসময়ের আলোচিত কথিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড। সচেতনতার অভাব, সঠিক তথ্য না থাকা, কিংবা লোভে পড়ে সেই ফাঁদে ধরা দেয় দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। কেবল বাংলাদেশ নয়, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রবাসী বাঙালিরাও হাত খুলে অর্থ দেন এ প্রতারক চক্রকে।
অনেকটা হুজুগের মতোই প্রতারণায় ঝুঁকে পড়ে কম সময়ে বড়লোক হওয়ার আশায় থাকা লোকজন। ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বড় কোনো বিনিয়োগ বা পরিশ্রম ছাড়াই বিপুল অর্থের মালিক হন এ সংস্থার কর্মকর্তারা। ২০০০ সালে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড নাম নিয়ে যাত্রার পর ১১ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৭। ডেসটিনি ২০০০-এর মুনাফা দিয়েই এ প্রতিষ্ঠানগুলো করা হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে গ্রাহক ছিল ৭০ লাখেরও বেশি। তবে শেষ পর্যন্ত ডেসটিনি গ্রুপ ও এ কাজে সহযোগী ৪৪ জনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা করা হয় ৪ হাজার ১১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের লুটে নেয়া অর্থের পরিমাণ আরও বেশি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন সাবেক সেনাপ্রধান ও ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট লে. জেনারেল (অব.) হারুন-অর-রশিদ ও ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনসহ এ গ্রুপের শীর্ষ ২২ পরিচালক।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বলছে, উচ্চহারে মুনাফার লোভ দেখিয়ে এমএলএম ব্যবসা পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে আট লাখেরও বেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
এমন পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির সম্পত্তি দখলে নেয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। ডেসটিনির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দিয়ে পুলিশকে এর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন আদালত। সে অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীতে ডেসটিনির সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে। আর রাজধানীর বাইরে এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের। তবে পুলিশের এক প্রতিবেদন বলছে, এমএলএম কোম্পানিটির ১১৬টি গাড়ির ৮১টিই এখনও জব্দ করতে পারেনি পুলিশ। ৫৮টি দামি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১৬টি বেদখল। ১৯টি জমির নয়টি এবং ১৪টি স্থাপনাসহ জমির তিনটি দখলে নিতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের জব্দ করা গাড়ি, বাড়ি ও জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে গিয়ে আটটি গাড়ি জিম্মায় নিয়েছেন কয়েকজন ব্যক্তি। জমির মালিকানা নির্ধারণের কয়েকটি আবেদনও বিচারাধীন। ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমিনের স্ত্রী ডেসটিনির পরিচালক ফারাহ দিবার স্বাক্ষরিত রসিদে অনেক বাসা থেকেই ভাড়া আদায় করছেন রফিকুলের বোন। আর এ-সংক্রান্ত মামলায় রফিকুল রয়েছেন কারাগারে। তবে তিনি বেশির ভাগ সময়ই চিকিৎসার অজুহাতে হাসপাতালে আয়েশি জীবনযাপন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা কারাগারে আটক রয়েছেন, জামিনে বের হয়েছেন কেউ কেউ। তবে কোম্পানিটির শীর্ষ কর্তাদের বেশির ভাগই রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ এদের সবার নামেই আদালতে মামলা রয়েছে, রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানাও। তা সত্ত্বেও শীর্ষ এসব কর্তারা রয়ে যাচ্ছেন অধরাই।
দুদকের প্রধান আইনজীবী খুরশীদ আলম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ডেসটিনির সম্পদ দখলে নেয়ার দায়িত্ব পুলিশের। তাতে এখনও ডেসটিনির পরিচালকদের জবরদখল চলছে। যদিও পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে। তবে ডিএমপির উচিত হবে প্রতি তিন মাস অন্তর ডেসটিনির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ থেকে আসা আয়-ব্যয়ের হিসাব আদালতে প্রতিবেদন আকারে জানানো। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, মামলা আদালতে বিচারাধীন। এ অবস্থায় এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
তবে হেলেনা আক্তার, আসমা খাতুন বা ওসমান গাজীর মতো সারা দেশের কয়েক লাখ গ্রাহকের বিনিয়োগ করা অর্থ উদ্ধারে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি কারও মধ্যেই। আদালতের নির্দেশনায় সম্পত্তি সরকারের দখলে নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশও সেসব সম্পত্তি দখলে নিতে তৎপর। তবে এসব গ্রাহকের সঞ্চয়ের কি হবে, তা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। ভুক্তভোগীরা জানান, অনেক কষ্টের টাকা ডেসটিনিতে বিনিয়োগ করেছিলেন লাভের আশায়। এখন সেই টাকা সাত-ভূতে খাচ্ছে। তাদের লাভের দরকার নেই। সরকার আসল টাকাটা তুলে দিলেই তারা খুশি। তাদের সবার প্রশ্ন, আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে? গত কয়েক বছরে এক টাকাও ফেরত পাননি এসব প্রতারিত গ্রাহক। আগামীতে যে পাবেন, তারও কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ কারও বক্তব্যেই উঠে আসে না গ্রাহকের আমানতের বিষয়টি। অথচ বেহাত হচ্ছে সম্পত্তির কিছু অংশ। কোনো কোনো কারখানার যন্ত্রপাতি হারিয়ে গেছে। বা অকেজো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। পার্বত্য এলাকায় কোম্পানির অধীনে থাকা গাছ চুরি হচ্ছে হরহামেশাই।
ডেসটিনির সার্বিক বিষয় নিয়ে ২০১৩ সালেই তদন্ত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ গ্রাহকদের টাকা ফিরিয়ে দিতে প্রশাসক নিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যদিও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘কাজ চলছে।’

Disconnect