ফনেটিক ইউনিজয়
সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ‘ঈদুল ফিতর’
লিয়াকত আলী

মাহে রমজানের পর আসে ইসলামের প্রধান দুই বার্ষিক উৎসবের একটি ‘ঈদুল ফিতর’। ঈদ অর্থ আনন্দ। আর ফিতর বলতে রোজার সমাপ্তি কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া বোঝায়। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর তার সমাপ্তি ঘটানো ও দিনের বেলায় পানাহারের স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে যাওয়া উপলক্ষে আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা। এটা শুধু অনুমতি নয়, বরং অনেকটা বাধ্যতামূলক নির্দেশ। কেননা শাওয়ালের প্রথম দিনে রোজা রাখাই নিষিদ্ধ। দুই ঈদের দিনে পানাহার করা ও আল্লাহর নেয়ামতের স্বাদ গ্রহণ করা অবশ্য পালনীয়।
ঈদের দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের দিন। নিজের মনের হিংসা, ঘৃণা, লোভ, অহঙ্কার, অহমিকা, আত্মম্ভরিতা, আত্মশ্লাঘা, রাগ, ক্রোধ, বিদ্বেষসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার আনন্দ। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির আনন্দ। আর মনের সব কালিমা দূর করে, মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান বিসর্জন দিয়ে সবাই হাতে হাত মেলানো অর্থাৎ সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন।
হাদিসের গ্রন্থগুলোয় বর্ণিত আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে মদিনায় এসে দেখলেন, এখানকার বাসিন্দারা বছরের দুটি দিন আনন্দ উৎসবে কাটায়। যদিও এর আগেই এখানকার অনেকে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রথাটি চালু ছিল। এ অবস্থায় মহানবী তাদের জানালেন, আল্লাহতাআলা মুসলমানদের আরও উন্নত ও উত্তম দুটি উপলক্ষ দান করেছেন আনন্দ উৎসবের জন্য। একটি রমজান মাসের শেষে শাওয়ালের প্রথম তারিখে। আরেকটি জিলহজ মাসের ১০ তারিখে বা হজের পরদিন। দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারার জন্য দুটি ঈদ নির্ধারিত হয়েছে।
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনায় আত্মনিয়োগের মাধ্যমে তাকওয়ার স্তর উন্নত করা এবং তার মাধ্যমে আল্লাহতাআলার একান্ত সান্নিধ্য ও অসাধারণ অনুগ্রহের উপযোগী হতে পারা নিঃসন্দেহে খুশির বিষয়। তেমনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ও শ্রম দিয়ে দীর্ঘ সফরের পর সম্পন্ন হয় হজ। ৯ তারিখ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের মাধ্যমে হজ আদায়ে সক্ষমতা প্রমাণিত হয়, যা আল্লাহতাআলার মেহেরবানিতেই সম্ভব। তাই পরদিন আনন্দ প্রকাশ যুক্তিসঙ্গত। যারা হজে যান না, তারা হাজিদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে খুশি উদযাপন করেন, যার নাম ঈদুল আজহা।
ঈদ আনন্দ উদযাপনেরই নাম। তবে তা প্রকাশের প্রধান উপায় সাব্যস্ত করা হয়েছে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনÑ তা যেমন শারীরিক ইবাদত, তেমনি অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমেও। ঈদুল ফিতরে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়। পাশাপাশি দিতে হয় সদকাতুল ফিতর। আর ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের পাশাপাশি সাধ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করতে হয়। দুই ঈদেই অপরিহার্য অনুষঙ্গ নামাজ রাখা হয়েছে এ বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য যে, পৃথিবীতে মানুষের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য মহান স্রষ্টার ইবাদত করা। এখানে তার লাগামহীন আচরণ ও ক্রিয়াকলাপের সুযোগ নেই। আনন্দ-বিনোদনের সময়ও তাকে স্মরণ রাখতে হবে মহান প্রভুর প্রতি আনুগত্যের কথা। তার প্রতি নিজেকে সমর্পিত করার চেতনা কখনই অনুপস্থিত থাকতে পারবে না মুমিনের জীবনে। ইবাদত মিশ্রিত আনন্দই মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য। অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ উপভোগের কোনো সুযোগ নেই তাদের।
প্রতিটি জাতি-গোষ্ঠী নির্দিষ্ট দিনে আনন্দ করে। সাধারণত দেখা যায় যারা ধনী, তারা আনন্দ-ফুর্তি করে, গরিব-অসহায়রা তা থেকে বঞ্চিত থাকে। কিন্তু ইসলামে ঈদের খুশি শুধু ধনীরা পাবে তা নয়, বরং গরিব-অসহায়রাও ঈদের খুশি ভোগ করবে। তাই ঈদুল ফিতরের সময় ধনীদের ওপর সাদাকাতুল ফিতর অত্যাবশ্যক করা হয়েছে। মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ ঈদুল ফিতর। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস মাহে রমজান। যারা মাহে রমজানকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন, তাদের জন্য ঈদ খুশির বার্তা নিয়ে আসে।
ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য হলো, আমি আল্লাহ পাকের এক বড় ইবাদত পালন করার তৌফিক পেয়েছি বলে তার শোকর আদায় করার জন্য ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছি। ঈদের নামাজে মুমিন বান্দার জন্য আনন্দও আছে, সেই আনন্দ খুশির বহিঃপ্রকাশ করা হয় আরেকটি হুকুম পালন করার মাধ্যমে। এ হলো আমাদের ঈদের আনন্দ উৎসবের তাৎপর্য। কারণ আমাদের আনন্দ উৎসব সবই ইবাদত। এতে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ রয়েছে।
রাসুলে করিম (সা.) বলেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। একটি হলো যখন সে ইফতার করে; দ্বিতীয়টি হলো যখন সে তার মাবুদ আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।’ (সহিহ বুখারি)
ঈদের দিনে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, মিসওয়াক করা, মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়া, গোসল করা, সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, আতর ব্যবহার করা, নামাজের আগে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা, ঈদুল ফিতর নামাজের আগে কিছু মিষ্টান্ন খাওয়া, তিন-পাঁচ বা বেজোড়সংখ্যক খেজুর বা খুরমা খাওয়া, ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে পড়া, দোয়া পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ, ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া, এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা, ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে খুশি প্রকাশ করা ইত্যাদি ঈদের সুন্নত। আল্লাহতাআলা আমাদের তার সুসংবাদের অধিকারী করুন। সবাইকে ঈদ মোবারক ।

Disconnect