ফনেটিক ইউনিজয়
আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ
দুর্বৃত্তায়নের নতুন শঙ্কায় ব্যাংকিং খাত
ইমদাদ হক

টালমাটাল এক পরিস্থিতি চলছে দেশের ব্যাংকিং খাতে। বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট তৈরি করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেসরকারি ব্যাংকগুলো একদিকে উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহ করছে যেমন, তেমনি সরকারি অর্থ তাদের ব্যাংকে জমা রাখার দাবিও আদায় করছে সরকারের কাছ থেকে। এর পরও দৃশ্যমান কোনো সুখবর মিলছে না এ খাতে। এমন অবস্থার মধ্য দিয়েই ব্যাংক মালিকদের প্রাপ্তির খাতায় যোগ হলো নতুন আরেক সুবিধা। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন থেকে সরকারি আমানত পাবে ৬ শতাংশ সুদে। সরকারি ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখতে এর বেশি সুদ দাবি করবে না। তবে এর মাধ্যমে নতুন ব্যাংকিং খাতে দুর্বৃত্তায়নের নতুন চিত্র দেখা যেতে পারে বলেও শঙ্কা বিশ্লেষকদের।
সরকারের কাছ থেকে এ পর্যন্ত মোটাদাগে যেসব সুবিধা নিয়েছেন, তার মধ্যে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো, ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো ও পুনঃক্রয় চুক্তি রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ থেকে ৬ শতাংশ করা উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে নতুন ৬ শতাংশে আমানত সংগ্রহের বিষয়টি যোগ হলো। গত ২৫ জুন তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়ে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈঠকে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের দাবির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বলতে গেলে ঋণের সুদহার এক ডিজিট বা ৯ শতাংশ করতে আমানত সংগ্রহে সুদ ৬ শতাংশ করা হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, এক অঙ্কে ঋণের সুদহার কার্যকর করতে কারও কোনো দ্বিমত নেই। কিছু ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সভায় এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে। আর যেসব ব্যাংক এখনও চূড়ান্ত করেনি, তারাও চলতি সপ্তাহেই পরিচালনা পর্ষদের সভায় এটি চূড়ান্ত করবে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বেসরকারি ব্যাংক ৬ শতাংশ হারে আমানত পাবে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অলস অর্থ পড়ে আছে। এগুলো বিভিন্ন বন্ডে রাখা স্বল্প সুদের বিনিয়োগে ৬ শতাংশের সুদে পাওয়া গেলে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সহজ হবে। এ লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আমাদের দাবি ছিল, তা পূরণ হয়েছে। এখন আর সুদহার কমিয়ে আনতে কোনো বাধা রইল না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যাংক মালিকরা সরকারের কাছ থেকে কৌশলে নানা সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের যদি শাস্তি না হয়, তাহলে যত সুবিধাই দেয়া হোক না কেন, এসব অনিয়ম বন্ধ করা বেশ কঠিন হবে। আর এতে গ্রাহকদের টাকা নিয়ে যথেচ্ছাচারকেই উৎসাহিত করা হবে বলে তাদের আশঙ্কা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘কিছু ব্যাংক মালিক কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন বলে মনে হচ্ছে। যেসব ব্যাংকের মালিকরা এখন হইচই করছেন, সেসব ব্যাংকের মালিকরা জনগণের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। ১০০ টাকা ডিপোজিট থাকলে ৮৫ টাকা ধার দেয়া যায়। কিন্তু যেসব মালিক ১০০ টাকার বিপরীতে ১২০-১১৫ টাকা অ্যাডভান্স করে বসে আছেন, তাদের তো শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। সেসব কিছুই হয়নি, বরং এসব মালিকই আবার নানা কায়দায় সরকার থেকে বাড়তি সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছেন।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের সংগৃহীত আমানতের মাত্র ৫৪ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে। বিধি অনুযায়ী ১৯ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হাতে ২৭ শতাংশ আমানত ‘অলস’ পড়ে আছে, যা ৬ শতাংশ সুদে সরকারের বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ হয়েছে। এ ‘অলস’ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ৯ শতাংশের কমে দিচ্ছে না রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।
২০০৯-১০ অর্থবছরেও ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ শতাংশের ওপরে। এর পর থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এটি নেমে দাঁড়িয়েছে ৬ শতাংশে। খাতটিতে সুশাসনের ঘাটতি যে চরম হারে বিদ্যমান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের খড়গ, ফারমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, আমানতের সর্বনিম্ন সুদ সাধারণ মানুষকে ব্যাংকবিমুখ করেছে। ব্যাংকিং খাতে অবাধ লুটপাট, ঋণখেলাপ আর অর্থ পাচারের মহোৎসব চললেও এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। বড় বড় ঋণখেলাপি থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্যদিকে বারবার সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকিং খাতকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বাজেটে ব্যাংকিং খাতের ঘাটতি মেটাতে আলাদা অর্থও রাখা হচ্ছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং খাতকে সহায়তা দেয়ার জন্য করপোরেট কর কমানো হয়েছে। এত কিছুর পরও যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তাও বলা যাচ্ছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে মোটাদাগে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। একের পর এক যে এ খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি আর দুর্নীতি ঘটে গেল, কোনো পদক্ষেপই নেয়া হলো না। বরং মালিকদের নতুন নতুন সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এসব সুবিধা পেয়ে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে যেতে পারে, বাড়তে পারে নতুন দুর্বৃত্তায়ন। আসলে বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবসা পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ভার সরকারের ওপর চাপিয়ে মালিকরা নিজেদের স্বার্থের সুরক্ষা চায়।’
যদিও বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদারের দাবি, সব ব্যাংকে তারল্য সংকট নেই। অতিরিক্ত বিনিয়োগ করায় কেউ কেউ এ সংকটে পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংকিং খাতে। তবে ‘অলস টাকা’ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা হলে অর্থনীতিতে গতি আসবে।

Disconnect