ফনেটিক ইউনিজয়
সংস্কৃতিবিমুখ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
মানিক রাইহান বাপ্পী, রাবি

প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বড় ভূমিকা ছিল। সাংস্কৃতিক কর্মীদের সৃজনশীলতা ও শৈল্পিকতায় অনুষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের থাকত উপচে পড়া ভিড়। তবে অতীতের সে ঐতিহ্য হারিয়ে এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে কর্মী সংকট, মতাদর্শগত পার্থক্য, রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিসহ বিভিন্ন কারণে রাবি ক্যাম্পাসের সেই ঐতিহ্য আজ আর নেই।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি, ‘অভিভাবক-শিক্ষকদের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিরুৎসাহী করার কারণেই সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।’
তবে শুধু যে অভিভাবক-শিক্ষকদের কারণেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভাটা পড়েছে তা নয়, দলীয় স্বার্থসহ বিভিন্ন কারণে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট থাকলেও নানা কারণে জোট থেকে বের হয়ে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ষাটের দশক থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রীতিমতো বিপ্লব শুরু হয়। যাবতীয় শিল্পচর্চায় মুখর ছিল পুরো ক্যাম্পাস, যা দেশাত্মবোধের সঠিক পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছে অত্যন্ত সৃজনশীল ও শৈল্পিকভাবে। এতে গণশিল্পের ওপর দেশের একমাত্র পিএইচডিপ্রাপ্ত সম্ভু সরকার, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অ্যাডভোকেট মিনা মিজানুর রহমান, বিখ্যাত আবৃত্তিকার খ. ম. সামছুজ্জোহা, কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর, কমেডিয়ান আবু হেনা রনির মতো ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছেন এখান থেকেই।
তবে অতীতের গৌরব হারিয়ে ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে রাবির ঐতিহ্য। শিক্ষক-অভিভাবকদের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, সর্বোপরি সাংস্কৃতিক চর্চার কাক্সিক্ষত পরিবেশ না থাকার কারণে আজ তা বৈচিত্র্য হারিয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় অনুশীলন নাট্যদলকর্মী লিমন বিশ্বাস বলেন, ‘পরিবার থেকে চায় ভালো কিছু করি। আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে এর প্রতিবন্ধক বলে মনে করা হয়। মাঝে মধ্যেই আমার আর্থিক জোগান বন্ধ করে দেয়ার ভয় দেখায় পরিবার।’
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ‘ফেসবুকের অতিরিক্ত ব্যবহার, অভিভাবকদের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংস্কৃতিচর্চার প্রতি শিক্ষকদের অনুৎসাহীকরণের ফলে আজ জাতীয়ভাবে এ সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার মান যেমন নেমে গেছে, তেমনি এর মাধ্যমে আগামী নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১২টি সাস্কৃতিক সংগঠন আছে। এর মধ্যে জোটভুক্ত আছে আটটি। সাংগঠনিক নীতিমালা ভঙ্গ, অপরাজনীতির শিকার হয়ে জোট ছাড়ছেন বলে অভিযোগ করছে জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া সংগঠনগুলো।
এ ব্যাপারে জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া সমকাল নাট্যচক্রের সভাপতি রাকিব রাইহানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা জোটের নেতৃত্বে আসেন, তারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে জোটের পদ নিয়ে পলিটিকস বেশি করেন। সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাজ করেন না। জোট জিম্মি হয়ে আছে ক্ষমতালোভীদের হাতে।’
তবে অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ইন্দ্রজিৎ কুমার বলেন, ‘এখানে কোনো পলিটিকস নেই। আমাদের নির্দিষ্ট চেতনা আছে, চেতনাবিরোধী কোনো কাজ করলেই সংগঠন থেকে বের করে দেয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিকাল ৫টা পর্যন্ত ক্লাস, মেয়েদের সন্ধ্যা ৮টার পর হলে ঢুকতে না দেয়া এবং সুষ্ঠু পরিবেশের কারণে কর্মী সংকট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এদিকে দৃষ্টি না দিলে আশঙ্কা হয়, ভবিষ্যতে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিলীন হয়ে যাবে।’
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. শাহ্ আজম শান্তনু বলেন, ‘জোটের কাজ দলগুলোর সমন্বয়। প্রতিটি সংগঠনেরই নিজস্ব কিছু নীতিমালা থাকে। যখন এ নীতিমালা পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়, তখন জোট থেকে সংগঠন আলাদা হয়ে যায়। এছাড়া দলীয় শৃঙ্খলা, জোটের নেতৃত্ব নিয়েও এ সমস্যা দেখা দেয়।’

Disconnect