ফনেটিক ইউনিজয়
জনশক্তি রফতানি : পর্ব-২
বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতে ভিসার মেয়াদ শেষ
আনছার আহমেদ

ইন্দোনেশিয়া ও নেপালের কর্মীরা বিনা খরচে মালয়েশিয়া যান। বাংলাদেশি কর্মীদের যেতে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এ টাকা তুলতে ২০ মাস কাজ করতে হয় বাংলাদেশিদের। ততদিনে ভিসার মেয়াদ শেষের পথে। হয় শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়, অথবা অবৈধ অভিবাসী হয়ে কম বেতনে কাজ করতে হয়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। মালয়েশিয়ায় পরিদর্শন শেষে কমিটির সদস্য ইস্রাফিল আলম জানিয়েছেন, বাংলাদেশি কর্মীরা ২০ মাসে মালয়েশিয়ায় যে টাকা বেতন পান, দেশটিতে যেতেই তাদের সেই পরিমাণ টাকা খরচ হয়।
শুধু মালয়েশিয়া যেতে নয়, উচ্চ অভিবাসন ব্যয় প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রেই হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিদেশে যেতে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয় বাংলাদেশিদের। কুয়েতে অন্য দেশের প্রবাসী কর্মীদের কাজ পেতে গড়ে ১ হাজার ৯৫৫ ডলার খরচ হয়। বাংলাদেশি কর্মীদের কাজ পেতে ব্যয় হয় ৫ হাজার ১৫৪ ডলার (৪ লাখ ১২ হাজার টাকা) পর্যন্ত। অন্য দেশের কর্মীরা তিন মাস কাজ করে অভিবাসন ব্যয় তুলতে পারেন। বাংলাদেশি কর্মীদের লেগে যায় দেড়-দুই বছর। বিশ্বব্যাংকের ‘নো ম্যাট’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য দেয়া হয়েছে।
দেশীয় সংস্থাগুলোর গবেষণায়ও একই কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশি কর্মীরা জমি-বাড়ি বিক্রি করে, সুদে ধার নিয়ে ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যান। অদক্ষ কর্মীরা মাসে যে বেতন পান, তাতে বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতেই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী এ ‘দুষ্টচক্রের’ শিকার। এ কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ কর্মী বিদেশে গেলেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় উপার্জন করতে পারছেন না। প্রবাসজীবনের কঠোর পরিশ্রমের আয়ের বড় অংশই চলে যায় বিদেশে যাওয়ার সময়ে খরচের দায় মেটাতে।
বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা চলে এলেও অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি সরকার। এ পরিস্থিতির জন্য সরকার দায়ী করে দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সিকে। রিক্রুটিং এজেন্সি দায়ী করে সরকার ও দালালকে। জনশক্তি রফতানি বিশ্লেষকরা বলছেন, সব পক্ষই সমান দায়ী।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি দায় স্বীকার করে বলেন, দালাল-মধ্যস্বত্বভোগীদের তাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি। অভিবাসন ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, উচ্চ অভিবাসন ব্যয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উদ্বিগ্ন।
সৌদি আরব যেতে সরকার নির্ধারিত ব্যয় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। কিন্তু জনশক্তি বাজারে প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো, ৭ লাখ টাকার কমে দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না বাংলাদেশি কর্মীরা। শুধু ‘ভিসা প্রসেসিং’ বাবদ ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা নেয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। প্রবাসী কল্যাণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ভিসা কেনাবেচার শাস্তি ১৫ বছর কারাদণ্ড। কিন্তু একজন কর্মীও ভিসা কেনা ছাড়া যেতে পারেন না।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশেনের গবেষণা তথ্যানুযায়ী, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে ব্যয় হয় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। বাংলাদেশি কর্মীদের খরচ হয় ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক অভিবসান সংস্থার তথ্যানুযায়ী, সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় হয় বাংলাদেশি কর্মীদের। তাদের দেয়া টাকার ৬০ ভাগ দেশি-বিদেশি দালাল-মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়।
সরেজমিনেও একই তথ্য পাওয়া গেছে। প্রবাসী কল্যাণ ভবনে কথা হয় নারায়ণগঞ্জের আবদুল মালেকের সঙ্গে। তিনি একসময় ওমান থাকতেন। ৪ লাখ টাকা খরচ করে ২০১৪ সালে দেশটিতে গিয়েছিলেন। তিন বছরের ভিসার মেয়াদ শেষে ফিরে আসেন। মাসে সব মিলিয়ে ৩০ হাজার টাকা উপার্জন করতেন। নিজের খরচ বাদ দিয়ে মাসে ১৫ হাজার টাকা দেশে পাঠাতেন। এ হিসাবে তিন বছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা দেশে পাঠান। এর মধ্যে ৪ লাখ টাকাই চলে যায় ওমান যাওয়ার সময় করা ঋণ পরিশোধে। যে টাকা সঞ্চয় করেছিলেন, তা দেশে ফেরার পর কয়েক মাসে শেষ হয়ে গেছে। তাই আবারও বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এবার যেতে চান সৌদি আরব।
মালেক জানালেন, তার চাচা সৌদি থেকে ভিসা পাঠিয়েছেন। তার পরও ২ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে ‘প্রসেসিংয়ে’। লাকী ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা প্রসেসিং করাচ্ছেন। কথা হয় লাকী ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধির সঙ্গেও। তিনি জানালেন, ৭ লাখ টাকার কমে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো যায় না। কর্মী নিজে ভিসা আনতে পারলে ২ লাখ টাকা লাগে। অথচ ভিসা প্রসেসিং, সরকারি ফি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিমান ভাড়া বাবদ সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা লাগার কথা। বাড়তি টাকা যায় এজেন্সি মালিক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পকেটে।
অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা সংস্থা রামরুর সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. সি আর আবরার জানালেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগীদের ভিসা কেনাবেচা, দালালের দৌরাত্ম্য ও সরকারের নীরবতার কারণেই অভিবাসন ব্যয় এমন লাগাম ছাড়িয়েছে। শ্রীলংকা, নেপাল, ভারত এমনকি পাকিস্তানের কর্মীরাও তিন-চার মাস কাজ করে অভিবাসন খরচ তুলতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশি কর্মীকে এজন্য কমপক্ষে নয় মাস কাজ করতে হয়। সৌদি আরবে যাওয়া কর্মীদের দুই-আড়াই বছর পর্যন্ত লেগে যায়। ততদিনে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। আবার টাকা দিয়ে মেয়াদ বাড়াতে হয়। বাংলাদেশি কর্মীদের আয় খেয়ে ফেলে দুই দেশের দালালরা।’
অভিবাসন বিশ্লেষক কিরণ আহমেদ চৌধুরী জানান, সৌদি নিয়োগকারীরা প্রয়োজন না থাকার পরও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেন। একটি ভিসা ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। ২০ হাজার টাকা বেতনে বাংলাদেশি কর্মী নিয়ে ছয় মাস রেখে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতন দিয়ে বিদায় দিয়ে দেন। তার পরও নিয়োগকারীর ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা লাভ থাকে। বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কর্মী পাঠিয়ে টাকা কামানোর জন্য সৌদি নিয়োগকারীদের মাধ্যমে এ অপকর্মটি করে। একই অবস্থা অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও।
তবে দায় নিতে নারাজ রিক্রুটিং এজেন্সির সংগঠন বায়রা মহাসচিব রুহুল আমিন। তিনি দাবি করেন, ‘এ পরিস্থিতির জন্য সরকার, কর্মী, এজেন্সি সবাই দায়ী। চাকরির তুলনায় কর্মীর সংখ্যা বেশি। এ কারণে অনেক কর্মীই চাকরি নিশ্চিত করতে বেশি টাকা দিয়েও বিদেশে যেতে রাজি হয়ে যান।’
বায়রার সাবেক সভাপতি আবুল বাসার জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যেসব কর্মী যান, তার ৯০ শতাংশই ভিসা কিনে যান। এখানেই বড় দুর্নীতি হয়। ভিসা কেনাবেচা নিষিদ্ধ হলেও কেন তা বন্ধ হচ্ছে না, এ প্রশ্নে প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, কর্মীদের কাছ থেকে অভিযোগ পান না। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Disconnect