ফনেটিক ইউনিজয়
আসামের পরিস্থিতিকে অবহেলার সুযোগ নেই
জাকারিয়া পলাশ
আসামে নাগরিকত্ব তালিকায় নিজের নাম আছে কিনা দেখতে বাঙালিদের দীর্ঘ লাইন
----

গত ৩০ জুলাই প্রকাশিত হয়েছে আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকা। ওই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে রাজ্যের ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ। এ বিপুলসংখ্যক বাংলাভাষী মানুষের জমি-জায়গা, ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত আসাম রাজ্যে হঠাৎ করে এত লোক রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়লে তাকে বাংলাদেশের জন্য বড় শঙ্কার বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে।
অবশ্য চূড়ান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির আগে আরও কিছুদিন সময় বাকি রয়েছে। ৩০ আগস্টের মধ্যে আপিল করে প্রয়োজনীয় নথি দেখানোর সুযোগ দেয়া হচ্ছে এসব মানুষকে। ২৮ সেপ্টেম্বর নাগাদ চূড়ান্ত তালিকা করা হবে। তবে এরই মাধ্যে বিশ্লেষণ হচ্ছে যে, ২৮ সেপ্টেম্বরের পর কী হতে পারে ভারতের ওই রাজ্যটিকে ঘিরে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রিফিউজি বা শরণার্থী সংকট বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আসামের বিপুলসংখ্যক বাংলাভাষী, যাদের অধিকাংশই মুসলিম- রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে অনেকেই। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশ কার্যত নীরব থাকার নীতি গ্রহণ করেছে। অনেকে মনে করছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় বলেই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ বাড়িয়ে কিছু করা ঠিক হবে না। আবার সচেতন মহলের অনেকেই মনে করছেন, এ ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনেক কিছুই করণীয় রয়েছে। কেননা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপারটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যে থাকলেও বরাবরই বাংলাদেশকে এর সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। তাছাড়া ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহের মতো দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশকে জড়িয়ে বক্তব্য দেয়া হয়েছে। কাজেই এখন বাংলাদেশের ভূমিকা নেয়া দরকার বলে অনেকে মনে করছেন।
আসামের এ সংকট বাংলাদেশে কী ধরনের সমস্যা নিয়ে আসতে পারে, সে বিষয়ে সম্প্রতি সাউথ এশিয়া মনিটরে এক নিবন্ধ লিখেছেন সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী। তিনি লিখেছেন, ‘প্রথমত, সেখানে বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মুসলিমদের বহিষ্কারের কথা বলা হচ্ছে। এতে সেখানকার বাঙালি হিন্দুরা তুলনামূলক নিরাপদ মনে করলেও, বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর বিপুল উত্তাপের সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থীদের চাপ বাড়তে পারে। আবার আসাম থেকে বের করে দেয়া লোকজনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হলে বাংলাদেশের অনেক কিছুর প্রয়োজন হবে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে।’
‘দ্বিতীয়ত, এ ঘটনায় বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা বিপুলভাবে বাড়বে। এর অর্থ হলো, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ঐতিহ্যবাহী ভারতবিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়বে। ফলে আশা করা যায়, বহিষ্কার হলেও তা হবে বাংলাদেশের নির্বাচনের পর। কারণ নির্বাচনের আগে হলে নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব বিস্তার করবে। এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে (বর্তমান সরকারের) ত্রাণকর্তার ইমেজ সৃষ্টি হলেও আসামের ঘটনা ওই ইমেজকে চুপসে দেবে। তৃতীয়ত, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বর্তমান সাফল্য চ্যলেঞ্জের মুখে পড়বে। চতুর্থত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ হবে। পঞ্চমত, বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়বে এবং উত্তেজনাও সৃষ্টি হতে পারে। ষষ্ঠত, বাংলাদেশের সামর্থ্য ও সম্পদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং সর্বোপরি এটা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করবে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত আলোচনা খুবই কম হলেও ভারতের অভ্যন্তরে রয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। সেখানে একদিকে বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারণার পাশপাশি বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যম বিপুলসংখ্যক সংখ্যালঘু নাগরিকের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার এ বিষয়টিকে বৈধতা দেয়ার প্রপাগান্ডা অব্যাহত রেখেছে। সেই সঙ্গে এসব মানুষকে শুধু প্রচারণার জোরে ‘বাংলাদেশি’ বানানোর বয়ান চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এর বিপরীতে সচেতন মহলের অনেকে মানবিক অধিকারের প্রশ্নটিও তুলছেন। যারা এ ন্যায্যতার প্রশ্নটি তুলছেন, তাদেরও অনেকেই ফেসবুক-টুইটারসহ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে বিজেপিপন্থী অনলাইনকর্মীদের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ছেন।
প্রসঙ্গত, ভারতীয় সাংবাদিক বারখা দত্ত তার এক টুইট বার্তায় বলেছিলেন, ‘আসামের বিষয়ে আমি বিশেষজ্ঞ নই। তবে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত রয়েছেন, যারা দেশে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এসব পরিস্থিতিতে আমার অন্যরকম একটা সন্দেহ আছে।’ এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় টুইটারে তাকে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে কথিত ‘বাংলাদেশিরা’ আসামে গিয়ে ভারতের ‘সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন’ করছে আর ‘জনসংখ্যার হার বদলে দিচ্ছে’ বলে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল ডিবিসি নিউজের রাজকাহনে এক আলোচনায় অংশ নেন সাংবাদিক ও কলামনিস্ট হুমায়ূন কবির, অধ্যাপক আমেনা মহসিন ও সাবেক কূটনীতিক শমসের মবিন চৌধুরী। নবনীতা চৌধুরীর সঞ্চালনায় ওই অনুষ্ঠানেও উঠে আসে, ব্যাপারটিকে বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে পারছে না। কিংবা বিষয়টিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেই কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া দিতে পারছে না। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের এ অবস্থান সঠিক। কিন্তু ভবিষ্যৎ শঙ্কা বিবেচনায় বাংলাদেশকে কিছু একটা করার যৌক্তিক অবস্থান খুঁজে পেতে হবে। এ বিষয়ে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ‘বিজেপি সভাপতি যখন বাংলাদেশকে জড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, তখন সেটাকে ধরে বাংলাদেশ একটা অবস্থান তুলে ধরতে পারে। তাছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পরে কোনো বাংলাদেশি ভারতে অবৈধভাবে যায়নি। এ বক্তব্যটিকে ভিত্তি ধরেই বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রীয় অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে।’
অধ্যাপক আমেনা মহসিন স্পষ্ট করেছিলেন যে, উদ্যোগটির পেছনে ভারতের হিন্দুত্ব প্রভাবিত আদর্শিক রাজনীতির ভূমিকা আছে, তা মাথায় রেখে বাংলাদেশকে চিন্তা করতে হবে। অবশ্য আফসান চৌধুরীর মতো ওই আলোচকরাও একটা বিষয় স্পষ্ট করেছেন যে, সংকটটি এখনই বিস্ফোরিত হবে না হয়তো। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের আগামী নির্বাচনের পর এ বিষয়ে কিছু হতে পারে। বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধান করলেও এর পেছনে ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী এজেন্ডা জড়িত রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পর এসব ভারতীয় নাগরিককে দেশছাড়া করা শুরু হতে পারে। কাজেই বিষয়টি অভ্যন্তরীণ হলেও দ্রুতই এটা সীমান্তবর্তী দেশগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান যাই হোক তা স্পষ্ট করা এবং তার পক্ষে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক সমর্থন অর্জনে কৌশল নির্ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশকে ভাবতে হবে। উল্লেখ্য, বিষয়টিকে বাংলাদেশ খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না বলা হলেও মাঝে মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আসাম সফরকালে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছিল। তবুও এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণের বিষয়ে তৎপর হওয়ার বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Disconnect