ফনেটিক ইউনিজয়
দুর্ভোগে প্রান্তিক কৃষক
প্রচারের বাগাড়ম্বরতায় কৃষিঋণ
ইমদাদ হক

স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতির যাত্রা কৃষির হাত ধরেই। সাড়ে চার দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাও উন্নয়নশীল দেশের পথে। শিল্প ও সেবা খাতে ভর করে প্রসারিত হয়েছে অর্থনীতির পরিধিও। তাই বলে গুরুত্ব কমেনি কৃষির। তাই তো কৃষি খাতকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে যেমন বাজেটে নিয়মিত রয়েছে ভর্তুকি, তেমনি রয়েছে কৃষকদের জন্য বিশেষ শর্তের সহজ ঋণের ব্যবস্থাও। যদিও তা কেবল খাতা-কলমেই কিনা, এমন প্রশ্নও আসছে ঘুরেফিরেই। চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লীঋণ হিসেবে নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। তবে তা যে প্রকৃত কৃষকদের খুব একটা কাজে আসবে না, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। একই কথা বলছে মাঠপর্যায়ের সরেজমিনের তথ্য-উপাত্তও।
কৃষকদের জন্য ঋণ প্রদানে অনেকটা হাঁকডাক করেই নীতিমালার জানান দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবারের মতো এবারের সংবাদ সম্মেলনেও বলা হয়, প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের স্বার্থে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার ৯ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা জোগান আসবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে। বাকিটা গুনবে বেসরকারি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক। এবারের নীতিমালায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সমন্বিত কৃষি, টার্কি পালন বা পেন পদ্ধতিতে মাছ চাষকে। গত অর্থবছরের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, সারাদেশে এ কর্মসূচির আওতায় ঋণ সুবিধা পেয়েছেন বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৫০ লাখ কৃষক।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড ৯৬১ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকার তহবিল বর্গাচাষীদের মধ্যে ব্র্যাকের মাধ্যমে বিতরণ অব্যাহত থাকবে। লক্ষ্যমাত্রার ৫২ শতাংশ বিতরণ করবে বেসরকারি খাতের ব্যাংক, সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক বিতরণ করবে ৩০ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংক বিতরণ করবে ১৫ শতাংশ ও বিদেশি ব্যাংক বিতরণ করবে ৩ শতাংশ ঋণ। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ বিতরণ করতে হবে শস্য খাতে, ন্যূনতম ১০ শতাংশ মৎস্য খাতে ও প্রাণিসম্পদ খাতে ১০ শতাংশ বিতরণ করতে হবে।
মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রান্তিক পর্যায়ের খুদে চাষীদের মাঠে পর্যাপ্ত জমি নেই। আবার মধ্যবিত্ত শ্রেণির কৃষকদের যেটুকুও বা আছে, তার দলিল-দস্তাবেজ হালনাগাদ করা নেই বেশির ভাগেরই। অথচ কৃষিঋণের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম জামানতের জন্য জমির হালনাগাদ দলিল ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। ফলে এ শর্তে কৃষকদের একটা বড় অংশ এসব ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার যারা ঋণ নিচ্ছেন, তারা মোটাদাগে মধ্যম শ্রেণির কৃষক। তাদের আয়ের ভিন্ন উৎসও রয়েছে, কৃষিনির্ভর নন তারা। কিছু ক্ষেত্রে যারা এ ঋণ পাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে ঋণ বা দাদন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে, যার সুদ ছাড়িয়ে যায় মাসিক ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত। পরিশোধ করতে না পারলে নেমে আসে নির্যাতনের খণ্ডগ বা মাঠের ফসল কিংবা ঘরের গরু-ছাগল হারানোর ভয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. এসএম মনিরুজ্জামান অবশ্য স্বীকারও করলেন বিষয়টি। বললেন, ‘সারাদেশে বেশকিছু অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সরকারি এক প্রতিবেদন বলছে, দেশের ২ কোটি ৬০ লাখ কৃষকের মধ্যে ৭৫ শতাংশই কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ পাননি। আবার যে ২৫ শতাংশ ঋণ পেয়েছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ নিয়েছেন বিভিন্ন এনজিও থেকে। ব্যাংকের কৃষিঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ হলেও এনজিও আদায় করছে ১৮-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। গত অর্থবছরে ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ২১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা করে ২০১৭ সালের জুনে কৃষিঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহার বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বছরের ১ জুলাই থেকে অন্য ঋণের সুদহারও সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ কার্যকরের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে অন্য ঋণে কমলেও সুদহার কমছে না কৃষিঋণে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঋণ বিতরণ করায় এনজিওদের খরচ বেশি। তাই ব্যাংকগুলো যখন এনজিওদের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ করবে, তখন কৃষকদের সর্বোচ্চ ২৪-২৫ শতাংশ সুদেই ঋণ নিতে হবে। এটি কমানো অনেক কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক অশোক কুমার দে। তিনি বলেন, প্রতিবছর কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু এর পরও বেশির ভাগ কৃষক ঋণ থেকে বঞ্চিত। এর প্রধান কারণ ব্যাংকগুলোর অনীহা। এছাড়া কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতিও হচ্ছে।
সুদহার কমানোর পক্ষে জোরালো মন্তব্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের। তিনি বলেন, কোনো অবস্থায়ই কৃষকদের ঋণের সুদহার ৫ শতাংশের বেশি করা উচিত নয়, এতে উৎপাদনশীল এ খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

Disconnect