ফনেটিক ইউনিজয়
হদিস মিলছে না ৩ লাখ ৬০ হাজার টন কঠিন শিলার
এবার গায়েব মধ্যপাড়া খনির পাথর
মারুফ আহমেদ

এবার পাথর উধাও। দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাথরের হদিস নেই। উৎপাদিত পাথর থেকে বিক্রীত পাথরের পরিমাণ বাদ দেয়ার পর ৫৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা মূল্যের পাথরের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। খনিমুখে নেই সেই পাথর। বিক্রির হিসাবেও নেই। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির প্রায় দেড় লাখ টন কয়লা ‘উধাও’ হওয়ার ঘটনা উদ্ঘাটনের পর পাথর খনির কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটিত হলো।
সম্প্রতি মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির (এমজিএমসিএল) বোর্ড সভায় এ গরমিলের তথ্য পাওয়া যায়। সভায় খনি কোম্পানি দাবি করে, সিস্টেম লস ও মাটির নিচে পাথর দেবে যাওয়ায় এমনটি ঘটেছে। গরমিল থাকা ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাথরের পরিমাণ অবলোপন করতে তারা বোর্ডকে অনুরোধ করে। তবে এ ঘটনা পেট্রোবাংলার দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর গত রোববার খনির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক জাভেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
এমজিএমসিএলের দাবি, পদ্ধতিগত লোকসানের পাশাপাশি এক বছরে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৯৬ টন পাথর মাটিতে দেবে গেছে। তবে কোম্পানির সাবেক কর্মকর্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা খনি কর্তৃপক্ষের দাবিকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের গাফিলতি বিশেষ করে পরিচালনা পরিষদ ও পেট্রোবাংলার সঠিক তদারকির অভাবে এমনটি ঘটছে।
জানা গেছে, ২০০৭ সালের ২৫ মে বাণিজ্যিকভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয় মধ্যপাড়ায়। প্রথম থেকে এ খনির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না। এটি কোম্পানিতে পরিণত হলেও হিসাব-নিকাশ করা হতো প্রকল্পের মতো। যন্ত্রপাতি না কিনেই কেনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। শুরুতে এর উন্নয়ন ঠিকাদার ছিল কোরীয় কোম্পানি নামনাম। আর কয়েক বছর ধরে খনি থেকে পাথর উত্তোলন করছে বেলারুশের কোম্পানি জিটিসি। এমজিএমসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, খনির ঠিকাদারের সঙ্গে এমন করে চুক্তি করা হয়েছিল, যাতে দুর্নীতির সুযোগ থাকে। ঠিকাদার যত পাথর উত্তোলন করবে, সে অনুসারে বিল পাবে। ফলে অনেক সময় হয়তো পাথর কম তুলে বেশি হিসাব দেখানো হয়েছে, এভাবেও ফাঁকি দেয়া হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এমজিএমসিএলের বোর্ড চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রুহুল আমীন বলেন, বিষয়টি এতদিন দৃষ্টিগোচর হয়নি। এখন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও খনি প্রকৌশলী ড. চৌধুরী কামারুজ্জামান বলেন, ‘খনির পুরো ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজড না হলে যেকোনো কিছু হতে পারে। এখানে সিস্টেম লস হতে পারে। তবে তা ৩-৪ শতাংশের বেশি হবে না। আর মাটিতে দেবে গেলেও সে পাথরের একটা বড় অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।’ খনি কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের ঠিকাদার পাথর তোলার সময় ওজন করলেও এ পাথর বাণিজ্যিক আকারে ভাঙার সময় ক্র্যাশিং পয়েন্টে কোনো ওজন মেশিন ছিল না। এছাড়া পাথর তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি করা হতো না।  খনি এলাকার বিভিন্ন স্থানে স্তূপ আকারে মজুদ করা হতো। ফলে অনেক পাথরখণ্ড মাটিতে দেবে যায়।
জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনেও ‘উধাও’ পাথর মাটির নিচে দেবে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত কোম্পানির সমন্বয় সভায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এমজিএমসিএলের মহাব্যবস্থাপক  (মার্কেটিং) আবু তালেব ফরাজীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ পর্যন্ত উত্তোলন করা পাথরে ১৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ পরিমাপগত ভুল ও ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ পদ্ধতিগত লোকসান হয়েছে। আর্থিক বিবরণী অনুসারে ২০০৬-০৭ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে পাথর উত্তোলন করা হয় ১৫ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬৯ টন। কমিটির হিসাবকৃত পরিমাপগত ভুল ও সিস্টেম লস বাদ দিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ টন। অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়ায় ২ লাখ ২৭ হাজার ২৩৩ টন। পরে ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত জিটিসি কর্তৃক উত্তোলিত পাথরের ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ সিস্টেম লস হিসাব করা হয়। আর্থিক বিবরণী হিসেবে জিটিসি চার বছরে ১২ লাখ ৭২ হাজার ৫৩৭ টন পাথর তোলে। কমিটির হিসাব করা সিস্টেম লস বাদ দিলে হিসাবে ঘাটতি দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৮৭ টন।
কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৯৬ টন পাথর মাটিতে দেবে গেছে। কমিটি তদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, সব মিলিয়ে ২০০৬-০৭ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত ১২ বছরে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ টন পাথর হিসাব আর্থিক বিবরণীতে বেশি দেখানো হয়েছে। কমিটি বলছে, এ পরিমাণ পাথর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে মজুদ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তারা সুপরিশ করেছে, উৎপাদনের সঙ্গে আর্থিক বিবরণীর মিল রাখার স্বার্থে এ অর্থ ও মজুদের হিসাবটা সমন্বয় (অবলোপন) করা যায়। প্রতিবেদনের সঙ্গে খনি কর্তৃপক্ষ সহমত পোষণ করে পরিচালনা পরিষদের প্রতিবেদন পেশ করে।  এতে আরও বলা হয়, এ হিসাব সমন্বয় করলে কোম্পানির লোকসান আরও বাড়বে।  এ প্রসঙ্গে এমডি প্রকৌশলী এসএম নুরুল আওরঙ্গজেব বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে।

Disconnect