ফনেটিক ইউনিজয়
হিরোশিমা ও নাগাসাকি দিবস
পারমাণবিক অস্ত্রের বিশ্বে যে হাতে ঘুড়ি সে হাতেই নাটাই
এ আর সুমন

বিশ্বরাজনীতির সহজ হিসাব, বিশ্বে কার ক্ষমতা বেশি! সোজাসাপ্টা উত্তর, পারমাণবিক অস্ত্রে যে দেশ যত সমৃদ্ধ, কাছাকাছি ক্ষমতাসীন ও ছোট দেশগুলোকে যারা এ পারমাণবিক ইস্যুতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে বা বিতর্কিত করতে পারে, তারাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড়ল। বর্তমান দুনিয়ায় এই মোড়ল কে! যুক্তরাষ্ট্র না রাশিয়া। অবাক করা বিষয়, পারমাণবিক অস্ত্রের উৎপাদন, ব্যবসা কিংবা সংরক্ষণের মাতব্বরিতে কিন্তু এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এগিয়ে। আবার তারাই বিশ্বের পরমাণু অস্ত্র নিরসনে কাজ করছে বলে ঘোষণাও দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের আতঙ্কও বেড়েছে।
পারমাণবিক বোমায় ভয়াবহতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষ সময়ে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মাটি থেকে ১ হাজার ৯০০ ফুট ওপরে মার্কিন যুদ্ধবিমান বি-২৯ এনোলা গে থেকে ৬৪ কেজি ওজনের প্রথম পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’ নিক্ষেপ করা হয়। বিস্ফোরণের সাথে সাথে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, আহত হয় অন্তত ৩৫ হাজার। এ ঘটনার ঠিক দুদিন পর অর্থাৎ ৯ আগস্ট জাপানের আরেক শহর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ নিক্ষেপ করা হয়। হামলায় প্রায় ৩৫-৪০ হাজার মানুষ মারা যায়, আহত হয় অন্তত ৬০ হাজার। এ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আরও অন্তত ৬০ হাজার মানুষকে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে। পারমাণবিক হামলায় যে ভয়াবহতা বিশ্ব ওই সময় দেখে, তা আজও ভুলতে পারেনি মানুষ। পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিবছর দিন দুটিকে বিশ্বব্যাপী স্মরণ করতে পালন করা হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকি দিবস। তবু কি পারমাণবিক অস্ত্রের আশঙ্কা, ভয়াবহতা থেমে আছে!
বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ রাষ্ট্রে কে, এ নিয়ে জানা দরকার। মূলত সব দেশেই এ পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে কড়া নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। তবু বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া প্রকাশিত তথ্যমতে, পৃথিবীর মোট নয়টি দেশের হাতে এখন নয় হাজার পরমাণু বোমা আছে। স্নায়ুযদ্ধে অবসানের পর এ সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে বলেও দাবি করছে দেশগুলো। পরমাণু অস্ত্র আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ার হাতে। ইসরায়েলের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে মনে করা হলেও তারা কখনও এ কথা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করেনি। তবে গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে ৬ হাজার ৮০০, রাশিয়ার সাত হাজার, ফ্রান্সের ৩০০, যুক্তরাজ্যের ২১৫, চীনের ২৭০, ভারতের ১৩০, পাকিস্তানের ১৪০, ইসরায়েলের ৮০, আর উত্তর কোরিয়ার আছে ২০টি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক বোমার সঠিক সংখ্যা নিয়েও কিন্তু বিতর্ক রয়েছে। কেউ দাবি করেন, এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে! এ নয়টি পরমাণু ক্ষমতাধর দেশ নিজেরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে লিপ্ত। যেমন ধরুন, যুক্তরাষ্ট্র বনাম উত্তর কোরিয়া, ন্যাটো বনাম রাশিয়া, পাকিস্তান বনাম ভারত।
কোথায় রাখা হয়েছে এসব পারমাণবিক বোমা! পরমাণু বোমাগুলো অনেক ক্ষেত্রে বসানো আছে ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায়। তাছাড়া আছে বিভিন্ন সামরিক বিমান ঘাঁটিতে বা অস্ত্রের গুদামে। বিভিন্ন দেশে এখন শত শত পারমাণবিক বোমা বসানো- ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা আছে। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বসানো আছে বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও তুরস্কে- সব মিলিয়ে এগুলোর সংখ্যা প্রায় ১৫০। অন্তত ১ হাজার ৮০০ পরমাণু বোমা আছে, যেগুলো খুব স্বল্প সময়ের নোটিসে নিক্ষেপ করা যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব পরমাণু শক্তিধর দেশই এখন তাদের অস্ত্রগুলোর আধুনিকায়ন করছে বা করার পরিকল্পনা করছে। সবচেয়ে বেশি পরমাণু বোমা আছে যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার হাতে। এ দুটি দেশের হাতে আছে ১৫ হাজার বোমা। তবে এ হিসাবে এমন বোমাও ধরা হয়েছে, যেগুলো এখন ‘অবসরে’ যাচ্ছে অর্থাৎ এগুলো অচিরেই খুলে ফেলা হবে। স্টকহোম পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, ১৯৮০-এর দশকে পারমাণবিক বোমা বা ওয়ারহেডের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার। বিভিন্ন সময় পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ দেশগুলো অস্ত্রের রোধে বিভিন্ন আলোচনা, চুক্তিতে মিলিত হলেও অনেকেই চুক্তি থেকে বের হয়ে গেছে, অনেকে অসম্মতি জানিয়ে সব উদ্যোগকে ভেস্তে দিয়েছে। ভারত, ইসরায়েল আর পাকিস্তান কখনও পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে সই করেনি। উত্তর কোরিয়া সই করেও ২০০৩ সালে এ থেকে বেরিয়ে যায়। এ চুক্তি অনুযায়ী স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হচ্ছে মাত্র পাঁচটি স্বাক্ষরকারী দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ও চীন। চুক্তিতে অস্বীকৃত দেশগুলোর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, বেলারুস, কাজাখস্তান ও ইউক্রেন তাদের পরমাণু কর্মসূচি পরিত্যাগ করেছে। অন্যদিকে চীন, পাকিস্তান, ভারত ও উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা বাড়িয়েছে বলে মার্কিন বিজ্ঞানীদের দাবি।
যুক্তরাষ্ট্র তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের ‘উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন’ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর এর নিন্দা জানিয়েছে চীন, রাশিয়া ও ইরান। পেন্টাগনের নীতিনির্ধারণী কৌশলপত্রে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন যে পরমাণু বোমা বানাবে, তা মূলত রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলা করার জন্য। এর কারণ, রাশিয়া মনে করছে, মার্কিন পরমাণু বোমাগুলো এত বড় আকারের যে, তা আসলে কখনও ব্যবহার করা হবে না, তাই এগুলোকে তারা হুমকি বলে মনে করছে না। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন ঠিক করেছে, তারা নতুন ধরনের ও ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা বানাবে। এসব বোমার ক্ষমতা হবে ২০ কিলোটন বা তার কম, তবে এর ধ্বংসক্ষমতা কিন্তু প্রচণ্ড, যা নাগাসাকিতে ফেলা বোমার ক্ষমতার সমান।
পরমাণু অস্ত্র ইস্যুতে কয়েকদিন আগে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শীর্ষপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরও উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে লাগাতার অভিযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি অব্যাহত রাখার অভিযোগের মধ্যেই পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ আনল ওয়াশিংটন। দেশটির বিরুদ্ধে এবার মার্কিন অভিযোগ- তারা নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ করছে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, উত্তর কোরিয়ায় এমন এক স্থাপনার সন্ধান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে এ ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির কাজ চলছে। গত জুনে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে আর কোনো ‘পারমাণবিক ঝুঁকি নেই’। তবে এর কিছুদিন পর থেকেই উত্তর কোরিয়ার সমালোচনা করে আসছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, উত্তর কোরিয়া সময়ক্ষেপণ করছে এবং কার্যত পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ করছে না। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পিয়ংইয়ংয়ের কাছেই সানুমডং ফ্যাসিলিটিতে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করা হচ্ছে। এ ফ্যাসিলিটি থেকেই উত্তর কোরিয়া তাদের প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল হোয়াসং-১৫ তৈরি করে। ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম।

Disconnect