ফনেটিক ইউনিজয়
মোবাইল ব্যাংকিং
গ্রাহকের দীর্ঘশ্বাসে ফেঁপে ওঠা অর্থনীতির গল্প
ইমদাদ হক

তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে দিনমজুরের কাজ করে শিশু শ্রমিক সালাউদ্দিন। মাস শেষে গ্রামের বাড়ি ভোলায় নিয়মিতই ৪-৫ হাজার টাকা পাঠায়। টাকা পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে স্বল্পশিক্ষিত মা-বাবার একমাত্র মাধ্যম মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ। কিন্তু ৫ হাজার টাকা পাঠালে অতিরিক্ত গুনতে হয় ১০০ টাকা সার্ভিস চার্জ। মাস শেষে মা-বাবার কাছে তাই ঠিকঠাক টাকা পাঠাতে পারলেও বাড়তি টাকা গোনার দীর্ঘশ্বাস রয়েই যায় সালাউদ্দিনের।
মোবাইল ব্যাংকিং বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের এ বাড়তি বোঝা এখন টানছে দেশের চার কোটিরও বেশি গ্রাহক। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সার্ভিস চার্জ অনেকটাই হাতের নাগালে। এক্ষেত্রে একটা নির্ধারিত পরিমাণ টাকার বেশি টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রেও গুনতে হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ সার্ভিস চার্জ। অথচ উল্টো চিত্র বাংলাদেশে, লেনদেনের পরিমাণ যত বাড়ে, পাল্লা দিয়ে বাড়ে সার্ভিস চার্জের পরিমাণও।
সুবিধাবঞ্চিতদের আর্থিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়াতে ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করলেও এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। মোট লেনদেনের ৫৫ ভাগেরও বেশি হয় বিকাশের মাধ্যমে। আর ডাচ্-বাংলার রকেটে ৩৮ শতাংশের কিছু বেশি, যেখানে অন্যান্য ব্যাংকের মার্কেট শেয়ার ৭ শতাংশের কাছাকাছি। বর্তমানে দেশে ১৯টি ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন রয়েছে। তবে এর মধ্যে ১৭টি ব্যাংক এ সেবা চালু করেছে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন বলছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। এ থেকে কোম্পানির নির্ধারিত হার অনুযায়ী দৈনিক কমিশন আসে ১১ কোটি ৯২ লাখ টাকার ওপরে। মাস শেষে যা দাঁড়ায় ৩৫০ কোটিতে, বছরে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর খুচরা পর্যায়ের এজেন্টরা অতিরিক্ত আদায় করেন আরও ১২০ কোটি টাকার মতো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ১০০ টাকা পাঠাতে লাগে ১ টাকা ৮৫ পয়সা। আর বেশির ভাগ রিটেইলার নেয় ২ শতাংশ করে। মোবাইল টু মোবাইল ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকার লেনদেনে কমিশন গুনতে হচ্ছে ২০০ টাকা। আর ৫০ হাজার টাকার লেনদেন করলে ব্যয় করতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা। অথচ ব্যাংকের মাধ্যমে ন্যূনতম একটি চার্জ দ্বারা সব ধরনের লেনদেন করা যায় বছরজুড়েই। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সেবা সাধারণত একটি বার্তার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়, যে বার্তার খরচ পড়ে মাত্র ২৫ পয়সা। ফলে দিন দিন এ সেবা অনেকটাই অসহনীয় হয়ে জনগণের ওপর আবির্ভূত হচ্ছে। যদিও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের খরচ নির্ধারণে এর নির্দেশনা অনুযায়ী কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেই।
অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ সম্পর্কে প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার খরচকেই দায়ী করছেন এর কর্ণধাররা। বিকাশের কর্ণধার কামাল কাদির বলেন, ‘মূলত সহজ পদ্ধতিতে ছোট পরিমাণ টাকা লেনদেন করার জন্যই বিকাশ ব্যবস্থার প্রবর্তন। প্রয়োজন ও চাহিদার তুলনায় এর পরিধি বেড়ে যাওয়ায় সার্ভিস চার্জ বেড়ে যাচ্ছে। তবে তা কমানোর প্রচেষ্টা রয়েছে।’
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অতিরিক্ত হারে সার্ভিস চার্জ আদায়ের নামে অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে, ধ্বংস করা হচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের সমৃদ্ধি বা সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র অর্থনীতি। প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকদের জিম্মি করেই অনৈতিকভাবে এ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। দেশের বিকাশমান অর্থনীতির গতিপ্রবাহ আরও বাড়াতে অবিলম্বে সার্ভিস চার্জ কমানো উচিত।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘অতিরিক্ত খরচ আদায়ের মাধ্যমে এ সেবা পদ্ধতিকেই বিতর্কিত করে তোলা হচ্ছে। যদিও দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীই এ সেবার আওতায় রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর সুবিধা ভোগ করছে একটি শ্রেণি- কেবল ব্যবস্থাপনার সাথে যারা জড়িত তারাই।’
গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) বলছে, বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর বিষয়টি আসে আফ্রিকা থেকে। সেখানে বিভিন্ন স্তরেই সার্ভিস চার্জ আদায় করা হয়। যদিও বাংলাদেশের সার্ভিস চার্জের পরিমাণ আফ্রিকাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দেশের সব মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকিং খাত। বিশেষ করে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ক্ষুদ্র সঞ্চয় কার্যক্রম সাফল্য পায়নি। ফলে মোবাইল ব্যাংকিং সহজেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে কেবল একটি কোম্পানি বিকাশের প্রসার নিয়ে! এ খাতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় সংস্থার পক্ষ থেকে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অর্থ লেনদেনের সার্ভিস চার্জ কমিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমরা খরচ কমানোর চেষ্টা করছি। সব খরচ তো আগে থেকে ঠিক করা থাকে। আমরা যদি হঠাৎ খরচ কমাতে চাপ দিই, তারা তা পারবে না। তাই এতে একটু সময় লাগছে।’

Disconnect