ফনেটিক ইউনিজয়
অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা মানতে রাজি নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
এম ডি হোসাইন

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা রোধে দুই বছর আগেই অভিন্ন নীতিমালা করেছে সরকার। কিন্তু ওই অভিন্ন নীতিমালা প্রায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই মানছে না। ফলে যে উদ্দেশ্যে নীতিমালা করা হয়েছিল, সেটিই ভেস্তে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্নভাবে চেষ্টা করার পরও এটি বাস্তবায়ন করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
জানা যায়, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা প্রত্যাখান করেছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন আচরণে বিপাকে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি। ফলে সম্প্রতি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে এ বিষয়ে বৈঠকও করেছে ইউজিসি। কিন্তু এতেও ইতিবাচক কোনো সাড়া দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। তবে ইউজিসি সরকারের এ নির্দেশনা পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কৌশল নির্ধারণ করছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনার পর একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই নীতিমালা এখনও অনেকেই মানছে না। এজন্য সম্প্রতি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে এ বিষয়ে বৈঠকও করা হয়েছে। কীভাবে এ অভিন্ন নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকে অনেক ধরনের পরামর্শও দিয়েছেন। আশা করি, এখন এ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। শিক্ষার মান বজায় রাখতে ও শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের একই মানে উন্নীতকরণের জন্য এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর পরও যদি কেউ বাস্তবায়ন না করে তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ এটি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, এটি বাস্তবায়ন করতেই হবে।’
তবে ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের দেয়া নির্দেশনা এরই মধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় মেনে চলা শুরু করেছে। আবার কেউ কেউ এ নিয়মের ধারেকাছেও যাচ্ছে না। তারা শিক্ষক নিয়োগে আগের মতোই তাদের স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতি করে যাচ্ছেন।
কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে, সেটাই কার্যকরী আছে। কিন্তু ইউজিসি কর্তৃক প্রণীত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি-পদোন্নয়নের বিষয়ে অভিন্ন নীতিমালা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসনের ধারণার পরিপন্থী। আমরা চাই পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এ নীতিমালা শিক্ষকবান্ধব করা হোক।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা আছে। তারা নিজেদের তৈরি করা আইন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এছাড়া বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছোট বিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে চান না। বিশেষ করে যারা ঢাকায় পড়াশুনা করেন, তাদের বেশিরভাগই গ্রামে যেতে চান না। ফলে অভিন্ন নিয়োগ নীতিমালা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়।’
জানা যায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাওয়া এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়, এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তাই মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা নেয়ার উদ্যোগ নিতে ও নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করার পরামর্শও দেয়া হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ওই বছরের এপ্রিলে ইউজিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের আগে কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন বা গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক ব্যক্তিগত তথ্যাদি যাচাই হয় না। ফলে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তি বা অপরাধীরা নিয়োগের সুযোগ পায়। শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়, এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হলে অনিয়মের সুযোগ হ্রাস পাবে। এছাড়া দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও পুল গঠন করা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে চাকরির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় স্বায়ত্তশাসনের ধারণা সমুন্নত রেখে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় সংস্কার বাঞ্ছনীয়।
পরে ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা জারি হয়। এতে শিক্ষক নিয়োগে পদোন্নতি, পদায়নসহ বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা হয়। তবে ওই সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতা ও উপাচার্যরা কেউ কেউ এ নির্দেশনা মানতে বাধ্য নন বলে জানিয়েছিলেন কমিশন ও মন্ত্রণালয়কে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে প্রথম এমন উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০২ ও ২০০৪ সালে অভিন্ন নিয়োগ নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত হয়। পরে ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও একবার এ উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মাঝখানে চার-পাঁচ বছর পরপর কখনও শিক্ষামন্ত্রী অথবা ইউজিসির চেয়ারম্যান উদ্যোগ নেন, কমিটি করেন, নতুন নতুন প্রস্তাব আসে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেলে শিক্ষকের বেতন-ভাতা নিয়ে জটিলতার পর প্রধানমন্ত্রী তা সমাধান করতে অভিন্ন নীতিমালা করার কথা বলেন। এরপর ইউজিসি এটি চূড়ান্ত করে।

Disconnect