ফনেটিক ইউনিজয়
ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন : যেভাবে উপকৃত হবে জনগণ
মো. শাহীন সরদার, বাকৃবি প্রতিনিধি

বিশ্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের জীবনরহস্য (পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং) উন্মোচন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলমের নেতৃত্বে গবেষক দলের অন্যান্য সদস্য হলেন- পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা, বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম ও ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা. গোলাম কাদের খান।

গবেষণা শুরুর গল্প
অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম একজন বিখ্যাত জৈব প্রযুক্তিবিদ। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ নিয়ে কিছু করার কথা ভাবেন তিনি। সঙ্গী করেন এমন কাজের সাথে জড়িত তারই তিন ছাত্রকে। যেকোনো প্রজাতির জীবনরহস্য উদ্ভাবন অনেক ব্যয়সাধ্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্বে প্রথমবারের মতো ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন তারা। এ সাফল্য একদিনে আসেনি। মূল পরিকল্পনা শুরু ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। এরপর অনেক ধাপ পেরিয়ে তথ্যগুলো জমা দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুক্তরাষ্টভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) তথ্যভা-ার থেকে ২৫ আগস্ট ২০১৭ স্বীকৃতি পায়। এছাড়া ২০১৭ সালের ২৯-৩০ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন ও চলতি বছরের ১৩-১৮ জানুয়ারি দুটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে গবেষণার বিষয় উপস্থাপন করা হয়। ধারাবাহিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই জনগণের সামনে গবেষণা কার্যক্রম উন্মোচন করে গবেষকদল।

উপকৃত হবে জনগণ
আবিষ্কারের ফলাফল সম্পর্কে প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম বলেন, আমরা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং করেছি। জিনোম সিকোয়েন্সিং হচ্ছে কোনো জীবের জিনোমে সব জৈব অণু কীভাবে সাজানো তা জানা। জিনোম হচ্ছে একটি জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এ তথ্য ব্যবহার করে পরবর্তীতে আমরা কাক্সিক্ষত গবেষণার মাধ্যমে ইলিশের সামগ্রিক উন্নয়ন করতে পারবো। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এজন্য আরও গবেষণা করতে হবে। ইলিশের জীবনরহস্য পুরোটাই আমরা নিজেরা করেছি, কোনো বিদেশি গবেষকের সহায়তা ছাড়াই। ফলে পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আরও কাজ করতে সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচনের সুফল জনগণ পাবে। এখন ইলিশের ব্যাপারে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, গবেষণা করে ইলিশের জিনকে প্রয়োজনে পরিবর্তন করে চাষ উপযোগীসহ কাক্সিক্ষত সকল পরিবর্তনই করা সম্ভব।
সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ইলিশের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন- প্রজননের সময় সাগর থেকে নদীতে আসে। ডিম ছাড়ার পর মা-ইলিশ সাগরে ফিরে যায়। ইলিশের রয়েছে স্বতন্ত্র স্বাদ। এদের জীবনচক্রে স্বাদু পানি ও লবণপানি প্রয়োজন হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের জন্য কোন জিন দায়ী, গবেষণা করে তা জানা সম্ভব। যখন আমরা এ বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণ জানতে পারব, তখন এসব বৈশিষ্ট্য আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, আমাদের উপযোগী করে নিতে পারব। গবেষণা করে দায়ী জিনগুলোকে শনাক্ত করতে পারলে এগুলো পুকুরে বা স্বাদুপানিতে চাষযোগ্য কিনা বা প্রতিবন্ধকতার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে পারব।
সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. মুহা. গোলাম কাদের খান বলেন, এ আবিষ্কারের ফলে বাংলাদেশি ইলিশের একটি আদর্শ জিনোম তৈরি হলো। পরবর্তীতে অন্য কোনো স্থানের ইলিশ নিয়ে গবেষণা করলে এ আদর্শকে ব্যবহার করে তুলনা করা যাবে। ইলিশের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আহরণমাত্রা নির্ণয়ের জন্যও এ গবেষণা সহায়ক হবে।
উল্লেখ্য, একক প্রজাতি হিসাবে বাংলাদেশে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ- মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। এ দেশের প্রায় চার লাখ মানুষ জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষভাবে ইলিশ আহরণের সাথে জড়িত। এ আবিষ্কারের সহায়তায় জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত করা সম্ভব।
ইলিশ একটি ভ্রমণশীল মাছ। এরা সারা বছর সাগরে বাস করে, কিন্তু প্রজননের জন্য সাগর থেকে বিভিন্ন নদীতে অভিপ্রয়াণ করে এবং ডিম ছাড়ার পর মা-ইলিশ সাগরে ফিরে যায়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রজননক্ষেত্রে নিসৃত ডিম থেকে পরিস্ফুটিত লার্ভাগুলো নদীতেই বড় হতে থাকে। জাটকা হওয়ার পর এগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরে ফিরে যায়। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেমন- অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, মাছ ধরার উপকরণের নিয়ন্ত্রণ, বছরের কিছু সময়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধকরণ এবং মাছ ধরা নৌকা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি- যা এ আবিষ্কারের সহায়তায় সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই রাখার জন্য গৃহীত কর্মসূচি সফল হতে হলে মাছের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা কার্যকলাপের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. গিয়াস ইদ্দিন আহমদ বলেন, ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন আমাদের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের জন্য এক বড় অর্জন। এটা এক যুগোপযোগী আবিষ্কার, যা পৃথিবীতে মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন এ তথ্য ব্যবহার করে পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষক আরও বৃহৎ পরিসরে কাজ করতে পারবে, আরও নতুন নতুন তথ্য উন্মোচন করতে পারবে।
এর সুফল সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, এর সুফল বলে শেষ করা যাবে না, এ তথ্য কাজে লাগিয়ে আমরা ইলিশের প্রকৃত প্রজননকাল নির্ণয়, উৎপাদন কম হচ্ছে কেন তা জানা, জলবায়ু পরিবর্তনে এর প্রভাব ও করণীয় সম্পর্কে জানা, এদের খাবার সম্পর্কে সম্যক ধারণা, স্বাদের কারণ- এমন অনেক কিছুই জানা সম্ভব হবে। মোট কথা, ইলিশের সম্পর্কে জানার দরজা খুলে গেল ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মুক্ত হলো।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটনের তথ্য থেকে আমরা ইলিশের সাগর থেকে নদীতে আসা ও যাওয়ার কারণ, পৃথিবীতে ইলিশের কতগুলো বাসস্থান (স্টক) আছে, ইলিশের প্রজননব্যবস্থা ইত্যাদি সর্ম্পকে জানা যাবে। এ গবেষণাকে মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার করতে পারলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে, সবাই উপকৃত হবে।
ইলিশের সার্বিক উন্নয়নে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উদ্ঘঘাটনের এ জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগাতে হলে এ বিষয়ে গবেষণা জোরদার করতে হবে। তাই পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার।

Disconnect