ফনেটিক ইউনিজয়
শিশুদের বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ি
শারমিনুর নাহার

আমাদের শিশুরা কেমন আছে? এ প্রশ্নের এক কথায় উত্তর, ‘ভালো নেই’। কেন ভালো নেই? হয়তো সাদা চোখেই তার প্রমাণ আমরা পাই। একটি পরিবারের জন্য একটি শিশু যেমন আনন্দের উৎস, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রেও শিশুরা আনন্দের উৎস হতে পারে। কিন্তু তা আমাদের দেশে হয় না। কেবল আমাদের দেশে নয়, পরিসংখ্যান বলে, সারা বিশ্বের শিশুরাই ভালো নেই। আমরা বড়রা, যাদের হাতে তাদের ভালো রাখার ক্ষমতা, তারাই শিশুদের ভালো রাখতে পারি না। শিশু যখন পরিবারের মধ্যে থাকে, তখন সে এক রকমের ‘ভালো বা ভালো নেই’-এর মধ্যে থাকে, আবার যখন পরিবার থেকে বাইরে আসে- স্কুল ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতায় মেশে- তখন তা আরেক রকমের ‘ভালো নেই’-এর মধ্যে থাকে। একটা বাসযোগ্য সমাজ, রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা করতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত শিশুকে ভালো রাখতে পারব না।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩০.৮ শতাংশ (০-১৪ বছর) শিশু। এ শিশুরাই আগামী দিনের পৃথিবী। তাই তাদের সুন্দর শারীরিক ও মানসিক গঠনের দিকে নজর দিতে হবে। সে যদি সুস্থ, সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে, তাহলে সে একটি সুন্দর, সুস্থ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারবে। আর তা যদি না হয়, তাহলে তার কাছে সেটা আশা করা সম্ভব নয়। ফলে আমাদের ওপরই দায়িত্ব বর্তায় আমরা কীভাবে তাকে সুস্থ, সুন্দর করে গড়ে তুলব। কিন্তু শিশু নির্যাতন দিন দিন বাড়ছে। সে পরিবারে নির্যাতিত হচ্ছে, স্কুলে নির্যাতিত হচ্ছে, আশপাশের মানুষের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ে সে আন্দোলিত, যা তার সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য গড়ে তোলার পক্ষে বাধা সৃষ্টি করে। শুধু পরিবারেই নয়, শ্রেণিবৈষমের কারণেও শিশুরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠছে। অর্থাৎ একজন গার্মেন্ট শ্রমিকের শিশু, একজন বস্তির শিশু, একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু এবং একজন উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশু- তারা সবাই বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে ৩ হাজার ৮৪৫টি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যা, ধর্ষণসহ দেশে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২ হাজার ৩৩টি শিশু। যেখানে ২০১৭ সালের প্রথম ছয় মাসে ছিল ১ হাজার ৪৯৬টি। ফলে দেখা যাচ্ছে, ১২ মাসে নির্যাতনের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৪৫। এ হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম ছয় মাসে শিশু নির্যাতনের হার বেড়েছে ২৬ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬টি শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার শিকার হয় ২১৬ শিশু, আত্মহত্যা ১৭০, সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫৮, পানিতে ডুবে ২৩৩ ও অন্যান্য কারণে ৫৯ শিশু মারা গেছে। হত্যার শিকার ২১৬ শিশুর মধ্যে অপহরণের পর হত্যা করা হয় ১৬, হত্যার উদ্যোগ ৫৪, পিতা-মাতার হাতে খুন ৩২, ধর্ষণের পরে খুন হয় ৩৯ ও শারীরিক নির্যাতন করে দুই শিশুকে হত্যা করা হয়। এসব পরিসংখ্যানের সত্যতা প্রতিদিন খবরের কাগজই প্রমাণ করে। প্রতিদিন যেমন দেশের কোথাও না কোথাও শিশুর প্রতি সহিংসতার খবর ছাপা হয়, তেমনি কিছু কিছু রোমহর্ষক ঘটনাও ব্যাপক আলোড়ন তোলে। মুখে বা পায়ুপথে সিলিন্ডারের নল ঢুকিয়ে পেটে গ্যাস দেয়া, গাছের সঙ্গে বেঁধে এলোপাতাড়ি মারধর, গৃহপরিচারিকাকে নির্যাতন, দোকানে কাজ করা শিশুটিকে নির্যাতন, স্কুলে শিক্ষকদের নির্যাতনÑ তুচ্ছ কারণে অমানবিক নির্যাতনের এসব খবর যেন আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে! আমরা কেবল দেখে যাচ্ছি, হাপিত্যেশ করছি। কারণ বিচার ব্যবস্থা নিশ্চুপ! একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে দিতে পারে, তা সবারই জানা। কিন্তু অভাব সেই বিচার ও শাস্তির।
ওয়ার্ল্ড ভিশন নামের একটি সংগঠনের তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্বে দিনে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ছয় শিশু শারীরিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শিশু বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তির সম্মুখীন হয়। আর বাংলাদেশে প্রায় ৮২ শতাংশ শিশু ১৪ বছরের আগেই বিভিন্নভাবে সহিংসতার শিকার হয় এবং ৭৭.০১ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এছাড়া ৫৭ শতাংশ শিশু কর্মক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও শিশু অধিকারকর্মীরা শিশুর ওপর নির্যাতনের কারণ হিসেবে সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের নিজের ভেতরের অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে দায়ী করেছেন। শিশু নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ সম্ভব নয়, তবে আইনের প্রয়োগ, বাবা-মা, পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানো গেলে শিশু নির্যাতন কমে আসবে বলে তারা মনে করেন। এজন্য নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সমন্বয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ে বিচার কাজ করা এবং অবশ্যই অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা।
শিশুর প্রতি ন্যূনতম নির্দয় আচরণও তার মানসিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেবল তা-ই নয়; শব্দ, কথা, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো হুমকি এমনকি পরিবারের অন্য ব্যক্তিদের ওপর করা আচরণও শিশুর মানসিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণে পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহ-বিবাদ সবসময় শিশুদের নজর এড়িয়ে হচ্ছে কিনা, এ ব্যাপারেও সচেতনতা দরকার। এমন কোনো আচরণ না করা, যা তার মানসিকতায় প্রভাব ফেলবে। এতে শিশুর মর্যাদা ব্যাহত হয়। সে বিশ্বাসী, দায়িত্ববোধ ও আত্মপ্রত্যয়ী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না।
পরিবার রাষ্ট্র ও সমাজের একটি শিশুর প্রতি ভূমিকা কম নয়। তার প্রতি নৈতিক আচরণ তাকে নীতিবান করবে, তার প্রতি মানবিক আচরণ তাকে হৃদয়বান করবে, তার প্রতি সময়ানুবর্তিতা তাকে শৃঙ্খলা শেখাবে, তার প্রতি যতœ তাকে সহানুভূতিশীল করবে। এজন্য নীতিনির্ধারণদের ভূমিকা ভীষণ জরুরি। তবেই শিশু নির্যাতন রোধ করা সম্ভব। তা না হলে আমরা কেবল অঙ্গীকারই করে যাব, কাজের কাজ কিছুই হবে না।

Disconnect