ফনেটিক ইউনিজয়
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি প্রকট ব্যবস্থা নেয়াটা জরুরি
এ আর সুমন
হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত বিশ্বব্যাংকের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিশ্বব্যাংকের এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হারটিং সেফার ও অন্যান্য কর্মকর্তারা
----

চলতি বছরের ঘটনা, বিশ্বজুড়ে গরমের তীব্রতা বহুগুণে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রচণ্ড তাপে মোট ১৮টি দাবানল হয়েছে। এর মধ্যে একটিকে রাজ্যটির ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী দাবানল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এথেন্সে উপকূলীয় এলাকায় দাবানলে ৯১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। জাপানে দাবদাহে এখনো পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে মোট ১২৫ জনের। পৃথিবীজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা কিন্তু হুট করে হয়নি। অনেক দিন ধরেই পরিবেশবিজ্ঞানীরা এমন আশঙ্কার কথা শুনিয়ে আসছিলেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের চেয়ে বর্তমানে বিশ্বের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর ফলাফল এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এবার আসা যাক আমাদের দেশের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে প্রতিবছরই তাপমাত্রা ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে। এগুলো মোকাবিলায় ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। জীবনযাত্রার মান অনেক নিচে নেমে যাবে। জিডিপি’র (মোট দেশজ উৎপাদন) ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষতি হবে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের ‘বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে’ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে এখনই কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হলে তা ভয়ঙ্কর অবস্থায় চলে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের কারণে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে দক্ষিণ এশিয়া। এ অঞ্চলের অর্ধেকের বেশি লোক ঝুঁকিতে আছেন। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ প্রত্যাশা করছে বছরে গড় হারে তাপমাত্রা বাড়বে ১ থেকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এর মোকাবেলা বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোনো পদক্ষেপ না নিলে বছরে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার মানুষের জীবনযাত্রার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, ওই জেলা সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি। সেখানে বিপুল পরিমাণে অবকাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওই জেলার আর্থিক ক্ষতি ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার এ দুই বিপদই বেশি। বেশি হুমকির মুখে রয়েছে এমন শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বন্দর, তেল শোধনাগারসহ অনেক বড় বড় অবকাঠামো ওই শহরে গড়ে উঠেছে। এ শহরটিও সমুদ্রপৃষ্ঠের অনেক কাছাকাছি। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এখানকার আর্থিক ক্ষতি অনেক বেশি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও এ বিভাগের মানুষের কম। ব্যাপক পরিমাণে বন ধ্বংস, জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার প্রতিবেশব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া এখানকার অধিবাসীদের বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এর সঙ্গে সেখানে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওই জেলাগুলোতে অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টির কারণে ভূমিধস বেড়ে গেছে। এতে জীবন ও সম্পদের বিপুল ক্ষতি হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। এই বিভাগে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসও সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালে আইলা, ২০১২ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভাগটি। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিক থেকেও এই বিভাগ পিছিয়ে আছে। যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক থেকে এই বিভাগ সবচেয়ে দুর্বল। এসব কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা এ বিভাগের কম। ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক জায়গায় থাকা সত্ত্বেও রাজধানী ঢাকাও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কম বিপদে নেই। এ শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি- প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২ হাজার ৩৩১ জন। এ শহরে অবকাঠামোর পরিমাণও বেশি। ঢাকা বিভাগের পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ নারীপ্রধান, কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ২৯ শতাংশ। এসব  বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানকার মানুষের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা কম। গবেষণার আলোকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফ্যান বলেন, আগামীতে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি কমে যাবে। আর জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া অবকাঠামো খাতেরও ক্ষতি হবে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন বিষয় শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে শনাক্ত বিষয়গুলোর ব্যাপারে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা সক্রিয় হবেন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। চিমিয়াও আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ মাইগ্রেশন হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদনটিতে জলবায়ু পরিবর্তনে সম্ভাব্য ক্ষতির প্রভাব মোকাবেলায় কৃষি খাতের বাইরে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির তাগিদ দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, কৃষি খাতের বাইরে ৩০ শতাংশ কর্মসংস্থান করলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীবনযাত্রার মান না কমে উল্টো বাড়বে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন হিমবাহ গলে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তুলনামূলক নিম্নভূমি বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। একই কারণে ভারতীয় মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় ও তৎসংলগ্ন স্থলভূমিতে বন্যার প্রাদুর্ভাব বাড়বে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।
অবশ্য বিশ্বব্যাংকের এমন সতর্কবার্তার মধ্যেও বাংলাদেশ এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। জলবায়ু পরিবর্তনে মোকাবিলার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার আশা করে। কিন্তু বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে চলে যাওয়ায় দাতা সংস্থার কাছ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া কঠিন হচ্ছে। ইতিমধ্যে দাতা সংস্থাগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে। অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে আমরা বিনিয়োগ আশা করছি।’
বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হাডিন শেফার বলেন, বিশ্বব্যাপী বিশেষত বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূর করার চেষ্টায় জলবায়ু পরিবর্তন একটি ‘মারাত্মক হুমকি’। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিকদের সহায়তা দেয়ার বিষয়টিও বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ। আর তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে থাকবে এবং সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
প্রায় বছর ত্রিশ আগে থেকে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর জন্য কড়া সতর্কতা জানিয়ে আসছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক সাইমন লুইস বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের হার  শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা প্রয়োজন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর বিষয়টি ক্ষমতা, অর্থ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সেই কারণে এ নিয়ে রাজনীতির সর্বস্তরে আলোচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। তখন একে কাগুজে চুক্তি থেকে বাস্তবায়নের পথে নেয়া যাবে। জলবায়ু ইস্যুতে ব্যবস্থা নেয়াটা খুবই জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Disconnect