ফনেটিক ইউনিজয়
কোটি লোকের কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক অঞ্চলে
ইমদাদ হক

২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। লক্ষ্য অর্জনে নেয়া হচ্ছে বহুমুখী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। যার একটি সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। কয়েক বছর আগে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই নেয়া হয় এ উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে কতদূর এগোলো অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ- এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব।

সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যেই সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। লক্ষ্য অর্জনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। যার মাধ্যমে বছরে অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে ২১টি অঞ্চলের। সবগুলোর কাজ পুরোদমে শুরু হলে এক কোটি লোকের নতুন কর্মসংস্থান হবে বলে মনে করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় কাজের ধীরগতি লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলতে পারে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের।  
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেজা এখন পর্যন্ত ৯৪টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য স্থান নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ২৩টি বেসরকারি। বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়েছে সাতটি অঞ্চল। অন্যগুলো সরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত হওয়ার কথা রয়েছে। আর বেজার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে ২১টি অঞ্চলে। এরই মধ্যে কোনো কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চল উৎপাদনও শুরু করেছে। তাদের উৎপাদিত পণ্য এখন রপ্তানি হচ্ছে। নতুন এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প কারখানা ছাড়াও, সৌরবিদ্যুৎ, তথ্য-প্রযুক্তি, কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ, পোল্ট্রি, অর্গানিক সার, বায়োগ্যাস প্লান্টসহ বিভিন্ন উদ্যোগের প্রস্তাব রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য করা আইনে বাইরের যে কোনো দেশ ও প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারবে। চলতি বছরের গত কয়েক মাসে অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।  
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে সুষম উন্নয়ন, পরিকল্পিত শিল্পায়ন আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান বাড়বে। রপ্তানি আয় বাড়ার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতেও শক্ত অবস্থান তৈরি হবে বাংলাদেশের। তিনি বলেন, দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারী টানতে সরকারের প্রণোদনাও রয়েছে। দেয়া হচ্ছে কর অবকাশ, আয়ের ওপর কর মওকুফ, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ আরও অনেক কিছুই। এরই মধ্যে তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, জাপান, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে বিনিয়োগের, কথা চলছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে কম খরচে বাড়তি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম বা স্বল্পমূল্যের শ্রম আমাদের বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। তবে, তার জন্য যে ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা, যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা বিদ্যুৎ-জ্বালানির সরবরাহ থাকা উচিত, তাতে অনেকখানিই পিছিয়ে রয়েছি। এ সমস্যা না কাটলে অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্ভাবনার বিপরীতে বিড়ম্বনারও ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।’
পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০ লাখ গাছও রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে বেজা। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চলে উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব এলাকা হিসেবে কমপ্লায়েন্ট শিল্প ইউনিট গড়ে তোলা হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে আগামী ৫ বছরে ২০ লাখ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবছর রোপণ করা হবে ৪ লাখ গাছ।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন নম্বর, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ব্যবসার আমদানি-রপ্তানিসহ সব মিলিয়ে ২০টিরও বেশি কাগজ জমা দিতে হয়। এর মানে প্রতি কাগজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। যা ব্যবসায়ীদের শুরুতেই হতাশ করে ফেলে। অর্থনৈতিক অঞ্চল যেমন সম্ভাবনার, তেমনি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতও জরুরি। যদিও এসব সমস্যার সমাধানে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
বেজা কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বহুমুখী বিনিয়োগের ব্যবস্থা থাকবে। এগুলো হবে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে। প্রতিটি অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট সংরক্ষিত থাকবে। একটি জোন হবে তৈরি পোশাকের জন্য। আবার সরাসরি আমদানি-রপ্তানির জন্য প্রক্রিয়াগত সব সুবিধাই থাকবে প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে। যাতে ব্যবসায়ীরা সহজেই বাণিজ্যিক যোগাযোগ করতে পারেন।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়নের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে তিন ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মানুষের এখন গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৮ বছর। আর জন্ম নেয়া প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে এখানে মারা যায় মাত্র ২৮ দশমিক ২ জন। শিক্ষার হার ছাড়িয়েছে ৭২ এর ঘর। যেখানে মাথাপিছু আয়ও ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। যা বাংলাদেশকে নিয়ে এসেছে ১৩৬তম স্থানে, যেখানে মোট দেশের সংখ্যা ১৮৯। দু’বছর আগেও যে অবস্থান ছিল আরও তিন ধাপ পেছনে।
ইউএনডিপি’র এ প্রতিবেদন বাংলাদেশকে বিশ্ব মাঝে নতুন মর্যাদায় তুলে ধরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, ‘গত কয়েকবছর ধরেই সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উন্নয়নে সরকার বিশেষ বরাদ্দ রাখছে। চলতি অর্থবছরে যার পরিমাণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারের এসব পদক্ষেপের প্রতিফলন এ রিপোর্টে উঠে এসেছে।’
এদিকে এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি মুনতাকিম আশরাফ বলছেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ টানতে এ ধরনের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহের দ্রুত উন্নয়ন জরুরি। গত কয়েকবছর ধরে বিশেষ এ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ঠিকই, তবে তা দৃশ্যমান করতে কাজের গতি বাড়ানো দরকার।’

Disconnect