ফনেটিক ইউনিজয়
এমডি পদে পছন্দের ব্যক্তি বসাতে সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট
কী মধু তিতাসে?
মারুফ আহমেদ

দুর্নীতি, অনিয়ম, গ্রুপিং ও অনৈতিক রাজনৈতিক চাপের জালে আটকে পড়েছে দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস। ব্যাহত হচ্ছে সংস্থাটির স্বাভাবিক কার্যক্রম। কমছে না গ্যাস চুরি। বাড়ছে অবৈধ সংযোগ। পকেট ভারী হচ্ছে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মচারী-কর্মকর্তার। রয়েছে কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) চাপ। মাঝে-মধ্যে অপকর্মের তদন্ত হলেও দায়ীদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না।
জনবল কম। আছে স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপ। ফলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ, গ্যাস চুরি বন্ধে জোরালো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। পছন্দের নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য হয় জোর তদবির। এখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদের জন্য চলছে দৌড়-ঝাঁপ।
পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুরের মতে, ‘তিতাস হলো ব্ল্যাকহোল (কৃষ্ণগহ্বর)। এখানে দুর্নীতিবাজরাই প্রভাশালী। সৎকর্মীদের সংখ্যা খুব কম। তিতাসে অবৈধ বাণিজ্য এতো বেশি যে, অনেক মিটার রিডার আজ হাজার কোটি টাকার মালিক। হয়েছেন জনপ্রতিনিধিও। দুর্নীতিবাজদের কাছে তিতাস যেন টাকার খনি। তাই এখানে অনিয়ম দূর করা দুঃসাধ্য।’
পেট্রোবাংলা ও তিতাস সূত্র জানায়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীসহ ১৪টি জেলায় গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস। কোম্পানিটির মাঠ পর্যায়ের কর্মী থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। একাধিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সময়ে তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলেও দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। বরং তারা পদোন্নতিসহ সব সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তিতাসে নিজস্ব সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠা করেছে। একাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে। সিন্ডিকটে যেমন তিতাসের নিজস্ব কর্মী রয়েছে, তেমনি আছে ঠিকাদার, রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দু’জন সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোক পরিচয় দিয়ে এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে কয়েকজন ব্যক্তি। নিয়োগ, পদোন্নতি বদলি, গ্যাস সংযোগসহ সংস্থার কার্যক্রমে আধিপত্য বিস্তারে সিন্ডিকেটগুলো পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তারা কোম্পানির শীর্ষ পদে পছন্দের ব্যক্তিকে বসাতে মরিয়া হয়ে উঠছে।
সিন্ডিকেটগুলোর ফাঁস হওয়া একাধিক ফোনালাপ এবং দুর্নীতির তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিতাসের মহাব্যবস্থাপক, ব্যবস্থাপক, উপব্যবস্থাপক থেকে ঠিকাদার, মিটার রিডাররা অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। তারা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন। গ্যাসের লোড বাড়িয়েছেন। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বাধা দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় তিতাসের নিয়ন্ত্রক পেট্রোবাংলা এসব ঘটনায় তদন্ত করেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিতাস কর্তৃপক্ষকে বার বার চিঠি দিয়েছে। কিন্তু সেসব নির্দেশনা কার্যকর হয়নি।
তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, অপকর্মের কারণে ২০০৮ সালে একজন উপ-ব্যবস্থাপকের বর্ধিত বেতন প্রত্যাহার করা হয়। ২০১২ সালে সাভার জোনে ওই কর্মকর্তাই অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় বাধা প্রদান করেন। সে সময় তিনি ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে পরিচালনা পরিষদ সেই কর্মকর্তা বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি এখন বিপণন বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে আরও প্রভাবের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যবস্থাপক ক্রয় বিভাগের একজন উপ-ব্যবস্থাপকের সঙ্গে মিলে তিতাসে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা ঢাকার একজন সংসদ সদস্যের কাছের লোক বলে নিজেদের পরিচয় দেন। শুধু এই ব্যবস্থাপক নন, অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দুর্নীতির বিষয়ে জানা গেছে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিনিময়ে তারা নগদ অর্থে কয়েক কোটি টাকা নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রশ্রয়েই এসব চক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও ঘটে অনিয়ম। একাধিক যোগ্য মহাব্যবস্থাপক থাকলেও উপ-মহাব্যবস্থাপক পদের ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (ডিএমডি) পদ। যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনে।
এ প্রসঙ্গে তিতাসের শীর্ষ দায়িত্বশীলরা বলছেন, কোম্পানিটিতে দুষ্টচক্র খুবই শক্তিশালী। তাদের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি। ফলে চাইলেও করার কিছু থাকে না। এসব বিষয়ে দু’জন সাবেক এমডি, দুইজন সাবেক ব্যবস্থাপক, যারা অন্য সংস্থায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন এবং পেট্রোবাংলার দু’জন সাবেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা জানান, দুর্নীতিবাজদের স্বার্থে আঘাত এলে তিতাসে কাউকে টিকতে দেয়া হয় না। একজন সাবেক এমডি বলেন, আগে এসব গ্রুপিং, অন্যায়-অনাচার প্রকাশ্যেই হতো। এখন আড়ালে চলে গেছে। স্বার্থরক্ষায় বর্তমানে সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে চলছে ঠাণ্ডা লড়াই।
দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না কেন, জানতে চাইলে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মীর মসিউর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের চাপে অনেক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।’ জ্বালানি সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগ পেলে তারা ব্যবস্থা নেন। এটা রুটিন কাজ।’ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়? প্রায় সবাই তো চোর।’
তিতাসের শীর্ষ নির্বাহী পদ দীর্ঘদিন ধরে চলছে ভারপ্রাপ্ত এমডি (চলতি দায়িত্ব) দিয়ে। এমডি নিয়োগের জন্য জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও তা থমকে গেছে। এমডি পদের জন্য ২০১৬ সালে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। ১৩ প্রার্থী আবেদন করেন, যার মধ্যে ভারপ্রাপ্ত এমডি মীর মসিউর রহমানসহ তিতাসের বর্তমান তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন। আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হলেও পরে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেমে যায়। এরপর পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. লুৎফর রহমানকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু জ্বালানি বিভাগ তাতে সায় দেয়নি। বর্তমান এমডি মীর মসিউরের চাকরির মেয়াদ চলতি অক্টোবরেই শেষ হচ্ছে। ফলে এমডি হিসেবে নিয়োগ পেতে আগ্রহী বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা চেষ্টা করছেন। তিতাসের সুবিধাভোগী একাধিক গ্রুপ তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ নানা অভিযোগ তুলছে। বর্তমান এমডি দুর্নীতিতে জড়িত বলে বলা হচ্ছে। অন্য আগ্রহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।
তিতাস কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কাজিম উদ্দিন বলেন, ‘কে এমডি হবেন এ নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। আগ্রহী প্রার্থী এবং তাদের সহযোগীরা একে- অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছেন।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মীর মসিউর রহমান বলেন, একটি মহল তার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছে। অন্য আগ্রহী প্রার্থী গাজীপুর অঞ্চলের ডিএমডি প্রকৌশলী মো. আবুল ওহাব বলেন, তার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে বিরোধী পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। এমডি পদে আবেদনকারী ময়মনসিংহ অঞ্চলের ডিএমডি মশিহুর রহমান বলেন, সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করাই তার কাজ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব বলেন, নিয়ম অনুসারে এমডি নিয়োগ দেয়া হবে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, সময়মতো সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

Disconnect